Advertisement
  • হোম
  • ধর্ম
  • ইবনে জাদআনের ঘর: ‘হিলফুল ফুজুল’ যেখানে গঠিত হয়

ইবনে জাদআনের ঘর: ‘হিলফুল ফুজুল’ যেখানে গঠিত হয়

প্রথম আলো

প্রকাশ: ৭ নভেম্বর, ২০২৬

ছবি: এআই / প্রথম আলো
ছবি: এআই / প্রথম আলো

‘ইবনে জাদআনের ঘরে একটি চুক্তি অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম।’ (বুখারি, আত-তারিখুল কাবির, ২/২৮৬, দাইরাতুল মাআরিফ আল-উসমানিয়া, হায়দরাবাদ, ১৯৪১)

আসুন, নবীজীবনের সঙ্গে পরিচিত ‘ইবনে জাদআনের ঘরে’র সন্ধানে শুরুতে আমরা ঘরের মালিক ইবনে জাদআন সম্পর্কে জেনে নিই।

তাঁর নাম আবদুল্লাহ ইবনে জাদআন ইবনে আত-তায়মি আল-কুরাশি আল-কিনানি। তিনি কোরাইশের অন্যতম নেতা এবং কায়েস আইলানের বিরুদ্ধে ‘ফিজার যুদ্ধে’ বনু কিনানার সব গোত্রের একক নেতা ছিলেন। উদারতা ও অতিথি আপ্যায়নের জন্য তিনি ব্যাপক পরিচিত ছিলেন।

বলা হয়ে থাকে, ‘প্রাথমিক জীবনে তিনি দরিদ্র ছিলেন; কেউ তাঁকে চিনত না। কিন্তু যৌবনে অনেক সম্পদের মালিক হন। সিরিয়া অভিমুখে বাণিজ্য কাফেলা পরিচালনা করার কথা যেমন ইতিহাসে আছে, তেমনি মক্কার কোনো এক পাহাড়ের গুহায় জুরহুমের পরিত্যক্ত গোপন সম্পদের সন্ধান পাওয়ার রসাত্মক গল্পও আছে।’ (আহমাদ ইবনে ওমর, রাইয়ুল আতিস ওয়া উনসুল ওয়াহিশ ফি শাজারাতি কুরাইশ , দারুল কুতুব আল-মিসরিয়া, কায়রো)

আমি আবদুল্লাহ ইবনে জাদআনের ঘরে একটি অঙ্গীকারনামায় উপস্থিত থেকেছি; এ চুক্তির বিপক্ষে আমাকে যদি লাল বর্ণের উটও কেউ পুরস্কার প্রদান করত, তবু আমি তা পছন্দ করতাম না; যদি ইসলামের মাঝেও এমনটিতে আমাকে আহ্বান করা হয়, তাতে আমি অবশ্যই সাড়া দেব।
বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস: ১২১১০

আবদুল্লাহ ইবনে জাদআন আত্মীয় সম্পর্কের দিক থেকে ছিলেন সাহাবি আবু বকরের পিতা আবু কুহাফার চাচাতো ভাইয়ের সন্তান। সংগত কারণে ইবনে জাদআনের ঘর আবু বকরের একই বাড়ি কিংবা পাশাপাশি হয়ে থাকবে।

এ ধারণাটি প্রবল হয়ে ওঠে হিজরি তৃতীয় শতকে মক্কার ইতিহাস গবেষক আল-ফাকিহি রচিত আখবারু মক্কা গ্রন্থের বর্ণনাধারা থেকে। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত একটি হাদিসের পর ইবনে জাদআনের ঘরের মালিকানা বদলের ইতিহাস তুলে ধরেন।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, মহানবী পাহাড়ের (সাওর গুহা) উদ্দেশে চলে গেলেন। আমি সংবাদ অন্বেষণে বের হলাম এবং দৃষ্টি রাখছিলাম যে কেউ আমাকে এ নিয়ে কোনো সংবাদ দিতে পারে কি না। আমি আবু বকরের বাড়িতে এলাম এবং আবু কুহাফাকে পেলাম। তিনি বের হয়ে আমার দিকে আসলেন, তাঁর সঙ্গে ছিল একটি লাঠি। আমাকে দেখে তিনি তেড়ে এলেন এবং বলছিলেন, ‘যেসব ছোকরা আমার ছেলেটিকে নষ্ট করেছে, তাদের মধ্যে এ একজন!’

ফাকিহি এরপর লিখেছেন, ‘তাঁদেরই ছিল দারু ইবনে জাদআন (ইবনে জাদআনের ঘর)। দুই আজয়াদের (আস-সাগির ও আল-কবির) মাঝখানে উপত্যকার উপরিভাগে একটি পথ ছিল। তাঁদের মধ্য থেকে আবদুস সামাদ ইবনে আলী তা বিক্রি করে দেন। অতঃপর বিক্রি প্রত্যাবর্তন করা হয় এবং তাঁদের মালিকানা পুনরুদ্ধার করা হয়। অতঃপর তা মক্কার উপত্যকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যখন মসজিদে হারাম প্রসারিত হয়।

‘ফলে উপত্যকা দারু ইবনে জাদআনের বর্ধিত একটু অংশ ছাড়া মানুষের ঘরবাড়িতে পূর্ণ ছিল। যেমন আবু উজারা মক্কির ঘর, মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহিম মক্কির ঘর—যে দুটি আল-আব্বাস ইবনে মুহাম্মদের ঘরের প্রায় লাগোয়া। এরপর এসব মালিকের কাছ থেকে তা মুহাম্মদ ইবনে সোলাইমান আজ-জাইনাবি ক্রয় করেন।

‘তিনি তখন মক্কার প্রশাসক। এরপর তিনি তা খলিফার ক্রীতদাস আবু ইয়াজদাদের নিকট বিক্রি করেন। তা আজ সিঁড়িতে রূপান্তর হয়েছে। এটাই সেই ঘরের অবশিষ্টাংশ, যাতে ‘হিলফুল ফুজুল’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।’ (আল-ফাকিহি, আখবারু মক্কা, ৩/৩২২, মাকতাবাতুল আসাদি, মক্কা, ২০০৩)

খলিফা আল-মাহদি মসজিদুল হারামের প্রশস্তকরণ কাজের সময় মসজিদের চত্বরকে মসজিদে অন্তর্ভুক্ত করে নেন এবং ইবনে জাদআনের ঘরকে চত্বরে পরিণত করেন। তাঁর পরিবর্তিত চত্বর আজও বর্তমান।

হিজরি নবম শতকের গবেষক তাকিউদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ আল-ফাসি বর্ণনাটি আরও সুস্পষ্ট করেন। খলিফা আল-মাহদি মসজিদুল হারামের প্রশস্তকরণ কাজের সময় মসজিদের চত্বরকে মসজিদে অন্তর্ভুক্ত করে নেন এবং ইবনে জাদআনের ঘরকে চত্বরে পরিণত করেন। তাঁর পরিবর্তিত চত্বর আজও (আল-ফাসির যুগে) বর্তমান। ইবনে জাদআনের ঘরের বর্ধিত একটু অংশ ছাড়া চত্বরে তখন মানুষের কিছু ঘরবাড়ি ছিল। (আল-ফাসি, আল-ইকদুস সামিন ফি তারিখি বালাদিল আমিন, পৃষ্ঠা: ৩৩, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৬)

এতক্ষণে আমরা নবীজির সিরাতে প্রবেশ করতে পারব, যা এ স্থানটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। নবীজীবনে ইবনে জাদআনের ঘরের স্মৃতি বেশ কয়েকবার এসেছে। তবে মূল ঘটনাটি ২০ বছর বয়সকালীন। কী সেই ঘটনা?

তালহা ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে আউফ বর্ণিত একটি হাদিসে আছে, মহানবী (সা.) বলেন, ‘আমি আবদুল্লাহ ইবনে জাদআনের ঘরে একটি অঙ্গীকারনামায় উপস্থিত থেকেছি; এ চুক্তির বিপক্ষে আমাকে যদি লাল বর্ণের উটও কেউ পুরস্কার প্রদান করত, তবু আমি তা পছন্দ করতাম না; যদি ইসলামের মাঝেও এমনটিতে আমাকে আহ্বান করা হয়, তাতে আমি অবশ্যই সাড়া দেব।’ (বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস: ১২১১০)

এই চুক্তির প্রেক্ষিত ছিল আরবের সেই বিখ্যাত ‘হারবুল ফিজার’ (বা ‘হারবুল ফুজ্জার’ তথা ‘পাপীদের যুদ্ধ’)। আরব ইতিহাসে চার-চারটি যুদ্ধ—যা নবীজির ১৪ থেকে ২০ বছর জীবনকালে সংঘটিত হয়। ইবনে কাসিরের মতে, সর্বশেষ যুদ্ধটি হয়েছিল ‘নাখলাহ ও উকাজের এলাকায়’। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২/৩৫৫, দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৮)

মহানবী (সা.) এ যুদ্ধের সময় সেই এলাকায় গিয়েছেন বলে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না; বরং তিনি চাচা জুবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের ব্যূহে দাঁড়িয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। (শিবলি নোমানি, সিরাতুন নবি , ১/১৪৪-১৪৫, দারুল মুসান্নিফিন শিবলি একাডেমি, আজমগড়, ১৯১৮)

তিনি বলেছেন, ‘আমি তাতে উপস্থিত ছিলাম আমার চাচাদের সঙ্গে এবং তাতে আমি তির নিক্ষেপ করেছি। তা না করাটা আমি পছন্দ করতাম না।’ (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/৬১, দার সাদের, বৈরুত, ১৯৬৮)

ইবনে হিশাম বলছেন যে নবীজি কাউকে আক্রমণ করেননি। সুহাইলি সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে তিনি যুদ্ধ করেননি। যুদ্ধ করার বয়স তাঁর ছিল না। তা ছাড়া এটি ছিল নিষিদ্ধ মাসগুলোতে। উপরন্তু নবীজির যুদ্ধ শুধু আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থার জন্য—যা এখানে অনুপস্থিত। (শিবলি নোমানি, সিরাতুন নবি , ১/১৪৪-১৪৫, দারুল মুসান্নিফিন শিবলি একাডেমি, আজমগড়, ১৯১৮)

সুহাইলির বক্তব্যের সমর্থনে ইবনুল জাওজির গ্রন্থে উদ্ধৃত একটি হাদিস তুলে ধরা যায়, ‘আমি ফিজারের দিন শুধু আমার চাচাদের তিরগুলো তুলে দিচ্ছিলাম।’ (ইবনুল জাওজি, আল-মুনতাজাম ফি তারিখিল উমাম ওয়াল মুলুক, ২/৩০৩, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯২)

নিহতের মাঝে আবু জাহেলকে খুঁজে দেখো; তাকে শনাক্ত করতে পারবে তার হাঁটুতে ক্ষতের চিহ্ন দেখে। আমি আর সে ভিড় করছিলাম ইবনে জাদআনের ভোজের সময়; আমি তাকে ঠেলে চলছিলাম এবং সে তার হাঁটুর ওপর পড়ে যায় এবং তা মচকে যায়; আর সে চিহ্ন তার হাঁটুতে রয়ে যায়।

নবীজি বদর যুদ্ধের সমাপ্তির দিকে ইবনে জাদআনের ঘরে ঘটে যাওয়া সেই দিনের একটি স্মৃতি মনে করেছিলেন। কী ছিল সেই স্মৃতি?

বদর যুদ্ধের পর আবু জাহেলের লাশ শনাক্ত করা যাচ্ছিল না। সবাই খুঁজছিলেন। কিন্তু শনাক্ত করা যাচ্ছিল না। তখন মহানবী (সা.) বললেন, ‘নিহতের মাঝে তাকে খুঁজে দেখো; তাকে শনাক্ত করতে পারবে তার হাঁটুতে ক্ষতের চিহ্ন দেখে। আমি আর সে ভিড় করছিলাম ইবনে জাদআনের ভোজের সময়; আমি তাকে ঠেলে চলছিলাম এবং সে তার হাঁটুর ওপর পড়ে যায় এবং তা মচকে যায়; আর সে চিহ্ন তার হাঁটুতে রয়ে যায়।’ (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২/২৭৬, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৬)

শেষ করার পূর্বে ইবনে জাদআনের প্রতিবেশীর প্রশ্নটি আলোচনা করা যায়। আবু বকরের কন্যা আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি বললাম, “আল্লাহর রাসুল, ইবনে জাদআন—যিনি জাহেলি যুগে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতেন; বঞ্চিতকে আহার দিতেন। সেসব কি তাঁকে (পরকালে) কল্যাণ দেবে?” তিনি বললেন, “তাঁকে কোনো কল্যাণ দেবে না। সে তো কোনো দিন বলেনি: ‘হে আমার প্রতিপালক, বিচার দিনে আমার ভুলগুলো ক্ষমা করুন’।”’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৬)

পাঠক, আল্লাহ তো গাফফার (মহা ক্ষমাশীল)। আসুন, তাঁকে বলি, ‘হে আল্লাহ, আমাদের সব কাজে কল্যাণ দিন। আমাদের ক্ষমা করুন।’

ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক : অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

Lading . . .