প্রাণীর প্রতি নবীজির মমত্ববোধ: ৭ হাদিস থেকে শিক্ষা
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু নিজের সুখ ও ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই মর্যাদার মূল দাবি হলো সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি দয়া, ইনসাফ ও অভিভাবকত্ব নিশ্চিত করা।
মহানবী (সা.) ছিলেন সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য প্রেরিত এক জীবন্ত রহমত—‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’। (সুরা আনবিয়া, আয়াত: ১০৭)
তাঁর সেই দয়ার ছায়া থেকে বঞ্চিত হয়নি কোনো অবলা পশু বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীটপতঙ্গও। নবীজির পবিত্র সুন্নাহর আলোকে প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ ও জীবকল্যাণের সাতটি মৌলিক শিক্ষা নিচে তুলে ধরা হলো:
গৃহপালিত পশুর কাছ থেকে শুধু সেবা নেওয়া নয়, বরং তার সুস্থতা ও আহার নিশ্চিত করা মালিকের জন্য শরিয়তসম্মত ফরজ দায়িত্ব।
একবার রাসুল (সা.) পথ চলতে গিয়ে ক্ষুধায় পেট পিঠের সঙ্গে লেগে যাওয়া একটি উট দেখতে পান।
পশুর এই কষ্ট দেখে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং সমবেত সাহাবিদের লক্ষ্য করে বলেন, ‘এই অবলা ও নির্বাক পশুগুলোর ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো! যখন তোমরা এদের পিঠে আরোহণ করবে, তখন এদের সুস্থ-সবল রেখেই আরোহণ করবে; আর যখন এদের খাবার দেবে বা এদের কাছ থেকে কাজ নেবে, তখনও এদের প্রতি যত্নবান হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৪৮)
অর্থাৎ পশুর ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত কাজ করানো কিংবা তাকে ক্ষুধার্ত রেখে তার ওপর চড়ে বসা ইসলামের দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট অপরাধ।
তৎকালীন যুগে নিজেদের মালিকানা নিশ্চিত করতে বা অবাধ্য পশুকে শায়েস্তা করতে মুখে গরম লোহার ছ্যাঁকা দিয়ে দাগ দেওয়া কিংবা মুখে প্রহার করা ছিল অতি সাধারণ ঘটনা।
একবার নবীজির সামনে দিয়ে এমন একটি গাধা নিয়ে যাওয়া হলো, যার মুখে গরম লোহার দাগ দেওয়া হয়েছিল। তা দেখে তিনি বললেন, ‘তোমরা কি জানো না, আমি সেই ব্যক্তির ওপর লানত বা অভিশাপ দিয়েছি—যে কোনো পশুর মুখে দাগ দেয় কিংবা মুখে আঘাত করে?’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১১৭)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, কোনো প্রাণীর চেহারায় আঘাত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১১৬)
পশুর কান্না ও ভাষা বোঝার অনন্য অলৌকিক ক্ষমতা ও মানবিক সংবেদনশীলতা ছিল নবীজির চরিত্রে। তিনি একবার মদিনার এক আনসারি সাহাবির খেজুরবাগানে প্রবেশ করলেন। সেখানে একটি উট নবীজিকে দেখে হঠাৎ কাতর স্বরে কাঁদতে লাগল এবং তার চোখ বেয়ে পানি পড়তে শুরু করল।
রাসুল (সা.) উটটির কাছে এগিয়ে গেলেন এবং পরম স্নেহে তার মাথার পেছনে ও কুঁজে হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করলেন।
এরপর তিনি উটের মালিককে ডেকে বললেন, ‘আল্লাহ তোমাকে এই পশুর মালিক বানিয়েছেন, অথচ তুমি কি এর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো না? এই অবলা প্রাণী তো আমার কাছে অভিযোগ করছে যে তুমি একে পরিশ্রমে ক্লান্ত করে মারো এবং ঠিকমতো খাবার না দিয়ে অনাহারে রাখো!’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৪৯)
প্রাণীর প্রতি সামান্য দয়া আল্লাহর দরবারে কত বড় মুক্তির কারণ হতে পারে, তা ফুটে উঠেছে নবীজির এক প্রসিদ্ধ বর্ণনায়।
নবীজি (সা.) বলেন, বনি ইসরাইলের এক ভ্রষ্টাচারী নারী তীব্র গরমে একটি কূপের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দেখতে পেল—একটি তৃষ্ণার্ত কুকুর জিহ্বা বের করে হাঁপাচ্ছে এবং তৃষ্ণায় কাতর হয়ে ভেজা মাটি চাটছে। কুকুরটির এই চরম কষ্ট দেখে নারীটির হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার হলো। স
নিজের পায়ের চামড়ার মোজা খুলে ওড়না দিয়ে বেঁধে কূপ থেকে পানি তুলে কুকুরটিকে পান করাল। তার এই একটিমাত্র আন্তরিক দয়ার কারণে আল্লাহ–তাআলা তার অতীত জীবনের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩২১)
একবার এক সফরে রাসুল (সা.) কোনো প্রয়োজনে কিছু দূর এগিয়ে গিয়েছিলেন। তখন সাহাবিরা একটি লাল পাখির (হুম্মারাহ) বাসা থেকে তার দুটি ছানা ধরে নিয়ে আসেন। মা পাখিটি ফিরে এসে ছানা হারানোর শোকে ছটফট করতে লাগল এবং তাদের মাথার ওপর শূন্যে ডানা ঝাপটাতে লাগল।
রাসুল (সা.) ফিরে এসে এই দৃশ্য দেখে ব্যথিত হয়ে বললেন, ‘কে তার ছানা ছিনিয়ে নিয়ে এই মা পাখিকে এমন কষ্ট দিল? অবিলম্বে ছানা দুটিকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দাও!’
একই সফরে তিনি দেখতে পেলেন একটি পিঁপড়ার ঢিবিতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে এখানে আগুন ধরিয়েছে?’
সাহাবিরা স্বীকার করলে নবীজি (সা.) বললেন, ‘আগুনের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ ছাড়া আর কারও অধিকার নেই কোনো প্রাণীকে আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬৭৫)
তিরন্দাজি বা লক্ষ্যভেদের অনুশীলনে কোনো জীবন্ত প্রাণীকে বেঁধে নিশানা হিসেবে ব্যবহার করা তৎকালীন আরবে এক নিষ্ঠুর বিনোদন ছিল। রাসুল (সা.) একে সরাসরি অভিশপ্ত কাজ বলে ঘোষণা করেছেন।
একবার আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) কিছু যুবকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যারা একটি জীবন্ত মুরগিকে বেঁধে তির নিক্ষেপের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে অনুশীলন করছিল। ইবনে ওমর (রা.) তাদের দেখে তীব্র ভর্ৎসনা করে বললেন, ‘কে এই কাজ করেছে? নিশ্চয়ই রাসুল (সা.) সেই ব্যক্তির ওপর লানত করেছেন, যে কোনো জীবন্ত প্রাণীকে লক্ষ্যবস্তু বা নিশানা বানায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫১৫)
মানুষের আহারের প্রয়োজনে হালাল পশু জবাইয়ের অনুমতি দেওয়া হলেও সেখানে কোনো প্রকার নিষ্ঠুরতা ইসলাম বরদাশত করে না। রাসুল (সা.) পশুর অন্তিম মুহূর্তেও তার কষ্ট সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ–তাআলা প্রতিটি বিষয়ের ওপর ‘ইহসান’ (সৌন্দর্য ও সর্বোত্তম সদাচরণ) বিধিবদ্ধ করেছেন। সুতরাং তোমরা যখন জবাই করবে, তখন উত্তম পদ্ধতিতে জবাই করবে; তোমাদের ছুরি ধারালো করে নেবে এবং পশুর কষ্ট লাঘব করে তাকে দ্রুত আরাম দেবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯৫৫)
অন্য হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি একটি ছাগলকে মাটিতে শুইয়ে তার মুখের ওপর পা রেখে তখনো ছুরি ধার দিচ্ছিল। রাসুল (সা.) তা দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন: ‘তুমি কি পশুকে দুবার মারতে চাও? তাকে মাটিতে শোয়ানোর আগেই তোমার ছুরি কেন ধারালো করে নাওনি?’ (মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস: ৭৫৩০)


