তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটার হারিয়ে যাচ্ছেন? গম্ভীরের বার্তায় বদলে যাওয়া ভারতের নির্বাচনী ছবি
গৌতম গম্ভীরের (Gautam Gambhir) মন্তব্য ঘিরে নতুন করে আলোচনায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ। সত্যিই কি টেস্ট, একদিনের ম্যাচ এবং টি-টোয়েন্টি— তিন ফরম্যাটেই নিয়মিত খেলা ক্রিকেটারের সংখ্যা কমছে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুধু তিন ফরম্যাটে ম্যাচ খেলার হিসাব নয়, একটি দলের তিন ফরম্যাটেই কোনও ক্রিকেটারের উপর কতটা নির্ভরতা রয়েছে, সেটিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতেই স্পষ্ট, তিন ফরম্যাটে খেলা ক্রিকেটার এখনও রয়েছেন, কিন্তু তিন ফরম্যাটেই দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে থাকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
২০১৮ সালেও তিন ফরম্যাটের তারকা ছিলেন হাতে গোনা
২০১৮ সালের ভারতীয় দলকে এই পরিবর্তন বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়। বিরাট কোহলি (Virat Kohli) সে বছর ১৩টি টেস্ট, ১৪টি একদিনের ম্যাচ এবং ১০টি টি-টোয়েন্টি খেলেছিলেন। সেই বছরে ভারতের তিন ফরম্যাটেই ব্যস্ত সূচি ছিল। ফলে কোহলি টেস্টে প্রায় নিয়মিত ছিলেন, ভারতের ৭০ শতাংশ একদিনের ম্যাচ খেলেছিলেন এবং অর্ধেকের বেশি টি-টোয়েন্টিতেও মাঠে নেমেছিলেন। এই হিসাব অনুযায়ী তাঁর ‘থ্রি-ফরম্যাট ডিপেন্ডেন্সি ইনডেক্স’ ছিল ৫২.৬। অর্থাৎ, শুধু তিন ফরম্যাটেই খেলা নয়, তিন ক্ষেত্রেই দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি।
তবে সেই সময়েও এমন ক্রিকেটার খুব বেশি ছিলেন না। তিন ফরম্যাটে খেলা বেশ কয়েক জন ক্রিকেটারের সবচেয়ে কম ব্যবহৃত ফরম্যাটের ম্যাচের হিসাব ধরলে সূচক ৫০-এর নীচে নেমে যাচ্ছিল। অর্থাৎ, তিন ফরম্যাটে খেলা আর তিন ফরম্যাটেই নিয়মিত ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা— দু’টি এক বিষয় নয়।
২০২২ সালের ছবিটাও একই কথা বলছে। সে বছর ভারত সাতটি টেস্ট, ২৪টি একদিনের ম্যাচ এবং ৪০টি টি-টোয়েন্টি খেলেছিল। ঋষভ পন্থ (Rishabh Pant) ছিলেন সবচেয়ে স্পষ্ট তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটার। তিনি সাতটি টেস্ট, ১২টি একদিনের ম্যাচ এবং ২৫টি টি-টোয়েন্টি খেলেছিলেন। তাঁর সূচক ছিল ৫০। বিরাট কোহলির ছিল ৪৫.৮, শ্রেয়স আইয়ারের ৪২.৫ এবং অক্ষর প্যাটেলের ৩৩.৩।
সূচি বাড়ায় বদলেছে দলের পরিকল্পনা
এই পরিসংখ্যান থেকেই গম্ভীরের মন্তব্যের আসল দিকটি বোঝা যায়। ২০১৮ সালের পর তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটার হঠাৎ করে হারিয়ে যাননি। সংখ্যাতেও টানা পতনের ছবি নেই। তবে টি-টোয়েন্টি ম্যাচের সংখ্যা বেড়েছে। একই সঙ্গে ক্রিকেটারদের কাজের চাপ সামলানো এখন দল গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে একজন ক্রিকেটারকে একই সঙ্গে টেস্ট, একদিনের ম্যাচ এবং টি-টোয়েন্টি দলের নিয়মিত সদস্য হিসেবে ধরে রাখা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে। গম্ভীর জিওস্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘কোচ এবং নির্বাচকরা স্বাভাবিক ভাবেই চাইবেন যত বেশি সম্ভব ক্রিকেটার তিন ফরম্যাটেই খেলুন। কিন্তু আগামী দিনে তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটারের সংখ্যা খুব কম হয়ে যাবে।’
২০২৬-এ ভারতের দলেই স্পষ্ট আলাদা ছবি
২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতের দল গঠনের ছবিতেও এই পরিবর্তন পরিষ্কার। শুবমান গিল (Shubman Gill) এ বছর টেস্ট ও একদিনের ম্যাচ খেলেছেন, কিন্তু টি-টোয়েন্টি খেলেননি। জশপ্রীত বুমরা (Jasprit Bumrah) একদিনের ম্যাচ এবং টি-টোয়েন্টি খেলেছেন, কিন্তু টেস্টে খেলেননি। অক্ষর প্যাটেল এবং ওয়াশিংটন সুন্দরও মূলত দুই সাদা বলের ফরম্যাটে রয়েছেন।
কুলদীপ যাদব (Kuldeep Yadav) তিন ফরম্যাটেই খেলেছেন ঠিকই, কিন্তু একটি টেস্ট, তিনটি একদিনের ম্যাচ এবং চারটি টি-টোয়েন্টি, যা তাঁর ক্ষেত্রে আগের মতো তিন ফরম্যাটে দলের নির্ভরতার ছবি তুলে ধরে না। আসন্ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ় সিরিজের দলেও ফারাকটা আরও স্পষ্ট। একদিনের ক্রিকেটের কাঠামোয় রয়েছেন শুবমান গিল, রোহিত শর্মা (Rohit Sharma) এবং বিরাট কোহলি। অন্য দিকে টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ের দলে রয়েছেন শ্রেয়স আইয়ার, অভিষেক শর্মা (Abhishek Sharma), বৈভব সূর্যবংশী (Vaibhav Sooryavanshi), ঈশান কিষান (Ishan Kishan) এবং সঞ্জু স্যামসন (Sanju Samson)। কুলদীপ যাদব এবং নীতীশ কুমার রেড্ডির মতো কয়েক জন ক্রিকেটার দুই দলের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করছেন।
অর্থাৎ, ক্রিকেটারদের শুধু একটি ফরম্যাট থেকে বিশ্রাম দেওয়া হচ্ছে না। ধীরে ধীরে আলাদা ফরম্যাটের জন্য আলাদা দল এবং আলাদা পরিকল্পনাও তৈরি করা হচ্ছে। তিন ফরম্যাটে খেলা ক্রিকেটার তাই পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে না। বরং যে ক্রিকেটার একই সঙ্গে টেস্ট, একদিনের ম্যাচ এবং টি-টোয়েন্টি— তিন দলেই নিয়মিত এবং গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, সেই ক্রিকেটারের সংখ্যাই কমে আসছে।