ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না সব্যসাচী?,গ্রাফিক্স: রাতুল মন্ডল

ঈশ্বর বার বার প্রমাণ করেন, চাইলেই সব পাওয়া যায় না: সব্যসাচী চৌধুরী

সব্যসাচী চৌধুরী, অভিনেতা

ধর্ম আর আধ্যাত্মিকতা — দু’টোকে আমি কখনও এক করে দেখি না। নিয়ম মেনে পুজো করা, তিথি মেনে আচার পালন করা কিংবা ধর্মের সমস্ত বিধিনিষেধ মেনে চলা, আমার ব্যক্তিগত জীবনে সে ভাবে নেই। আমি নিজেকে প্রচণ্ড ধার্মিক বা ধর্মীয় আচারসর্বস্ব মানুষ বলব না। তবে একটা বৃহত্তর শক্তিতে আমার বিশ্বাস রয়েছে। এমন একটা আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব, যা আমাদের চেনা জগতের বাইরে থেকেও কোথাও যেন রয়েছে, তাকে আমি অস্বীকার করতে পারি না। আমার কাছে স্পিরিচুয়ালিটি আর রিলিজিয়সিটির মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। আমি প্রথমটায় বিশ্বাসী, কিন্তু দ্বিতীয়টির প্রচলিত অর্থে গোঁড়া নই।

অথচ দীর্ঘদিন ধরে পর্দায় এমন কিছু মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেছি, যাঁদের গোটা জীবনটাই ঈশ্বরের সন্ধানে কেটেছে। কখনও বামদেব, কখনও রামপ্রসাদ, আবার কখনও অন্য কোনও পৌরাণিক বা আধ্যাত্মিক চরিত্র। বিশেষ করে সাধক বামদেবের চরিত্র আমার অভিনয়জীবনের সঙ্গে এমন ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে যে, সেই চরিত্রের সূত্র ধরে নিজের মধ্যেও অনেক কিছু খুঁজে দেখার সুযোগ হয়েছে। তবে কি বামদেবকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে আমার নিজের জীবনদর্শনেও বদল এসেছে? উত্তরটা এককথায় দেওয়া কঠিন।

টেলিভিশনে বহু বছর বামদেবের চরিত্রে অভিনয় করেছি। শুধু অভিনয় করেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি। চরিত্রটিকে বুঝতে, তাঁর জীবনদর্শন উপলব্ধি করতে আমাকে অনেক পড়াশোনা করতে হয়েছে। রামপ্রসাদের চরিত্রে অভিনয়ের সময়ও একই ভাবে বিভিন্ন বই পড়েছি। চরিত্রের প্রস্তুতির জন্য যে পড়াশোনা শুরু হয়েছিল, তা ক্রমশ আমার নিজের জানার আগ্রহও বাড়িয়েছে। কিছু কিছু ধারণা তৈরি হয়েছে, কিছু মতাদর্শের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। হয়তো সেই অর্থে আমার মধ্যে একটা দার্শনিক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমি হঠাৎ করে ধর্মের প্রতি গোঁড়া হয়ে উঠেছি।

সব্যসাচী চৌধুরী

আসলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ক্রমে পরিণত হয়। ধৈর্য বাড়ে, বিচক্ষণতা আসে, দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আগে তারাপীঠে গিয়েছি, মন্দিরে পুজো দিয়েছি, মায়ের দর্শন করে ফিরে এসেছি। কিন্তু যত এই বিষয়গুলি নিয়ে পড়েছি, যত জেনেছি, ততই মনে হয়েছে, আগে হয়তো অনেক কিছুই জানতাম না। শুধু মন্দিরে যাওয়া আর পুজো দেওয়ার বাইরেও যে একটা বিশাল দর্শন রয়েছে, সেটা বুঝতে পেরেছি। ফলে আগের তুলনায় জানার আগ্রহ বেড়েছে। তবে সেই আগ্রহকে ধর্মীয় আচার পালনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে চাই না।

অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেন, বামাক্ষ্যাপার মতো চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে কখনও কোনও অলৌকিক অভিজ্ঞতা হয়েছে কি না। এমন কিছু অনুভব করেছি কি না, যা সাধারণত ব্যাখ্যা করা যায় না। আমি বারবারই বলেছি, আমার জীবনে তেমন কোনও দৈবিক বা অলৌকিক ঘটনা ঘটেনি। হয়তো আমি সেই অর্থে যথেষ্ট পুণ্য অর্জন করিনি, তাই এমন কোনও অভিজ্ঞতা হয়নি! তবে অলৌকিক কোনও ঘটনার সাক্ষী না হলেও বামদেব, রামপ্রসাদের মতো চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়াটাকেই আমি আশীর্বাদ বলে মনে করি।

তবে অভিনয় করতে গিয়ে একটা বিষয় খুব ভালো ভাবে উপলব্ধি করেছি। বাস্তব জীবনে মন্দিরে গিয়ে পুজো করা, ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি প্রকাশ করা যতটা সহজ, ক্যামেরার সামনে সেই ভক্তি ফুটিয়ে তোলা ততটাই কঠিন। ভক্তিটা যদি অন্তর থেকে না আসে, তা হলে অভিনয়ের মাধ্যমে তাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায় না। শুধু সংলাপ বললে বা নির্দিষ্ট কিছু ভঙ্গি অনুসরণ করলেই সাধকের অনুভূতি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সেই চরিত্রের বিশ্বাস, তাঁর আকুলতা, ঈশ্বরের প্রতি তাঁর সমর্পণের জায়গাটা বুঝতে হয়। বামদেবের চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে এই বিষয়টা বারবার অনুভব করেছি।

তবে আমার কাছে অলৌকিকতার সংজ্ঞাটাও একটু অন্য রকম। একই ঘটনা একজনের কাছে কাকতালীয়, অন্য কারও কাছে অলৌকিক, আবার কেউ হয়তো মনে করেন, এমনটাই হওয়ার ছিল। আসলে আমরা কে, কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঘটনাটিকে দেখছি, তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। ধরুন, কেউ ঈশ্বরের কাছে কিছু চাইলেন এবং তাঁর সেই চাওয়া পূরণ হল। তাঁর কাছে সেটা অলৌকিক মনে হতেই পারে। কিন্তু আমি নিজে কখনও মন্দিরে গিয়ে কিছু চাইনি। মন্দিরে গিয়েছি, পুজো দিয়েছি, কিন্তু নিজের কোনও চাহিদা নিয়ে ঈশ্বরের সামনে দাঁড়াইনি।

এর একটা ব্যক্তিগত কারণও রয়েছে। আমার যেটুকু করার, সেটা আমি নিজেই করব। নিজের জন্য ঈশ্বরের কাছে কিছু চাওয়ার অভ্যাস আমার কোনও দিনই তৈরি হয়নি। কারণ, মন্দিরে গিয়ে কিছু চাইলেই যে তা পাওয়া যাবে, এমন তো নয়। জীবনে সব কিছু আমাদের ইচ্ছেমতো হয় না। ঈশ্বরের কাছে চাইলেই সব পাওয়া যায় না, এই সত্যিটাও বারবার সামনে আসে। তাই আমি কিছু চাইতে মন্দিরে যাই না। বরং কখনও গেলে নিজের কথা জানিয়ে আসি। কী করছি, কী করতে পারলাম, সেইটুকুই যেন জানানো।

এ প্রসঙ্গে রামকৃষ্ণদেবের একটি কথা মনে পড়ে। মন্দিরে গিয়ে মানুষ সাধারণত কিছু না কিছু চায়। কারও অসুস্থ আত্মীয়ের সুস্থতা প্রয়োজন, কারও অর্থ, কারও কাজ, কারও নিজের জীবনের কোনও সমস্যার সমাধান। কিন্তু কতজন ঈশ্বরকেই পাওয়ার জন্য কাঁদেন? ঈশ্বরকে না পাওয়ার যন্ত্রণায় কতজনের চোখে জল আসে? আমার মনে হয়, এখানেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রকৃত সাধকের একটা বড় পার্থক্য। বামদেব ঈশ্বরকে পাওয়ার আকুলতায় কেঁদেছেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও ঈশ্বরের মধ্যে বিলীন হয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় কেঁদেছেন। তাঁদের কাছে ঈশ্বর কোনও চাহিদা পূরণের মাধ্যম ছিলেন না, বরং ঈশ্বরকে পাওয়াটাই ছিল জীবনের একমাত্র সাধনা।

বামদেবের চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে আমি বহুবার কেঁদেছি। চরিত্রের সেই আকুলতা, সেই ব্যাকুলতা অভিনয়ের মুহূর্তে আমাকে ছুঁয়ে গিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মন্দিরে গিয়ে কখনও সে ভাবে কাঁদিনি। কারণ আমি তো সাধক নই। সব কিছু ছেড়ে ঈশ্বরের মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার মতো কোনও বাসনা আমার নেই। আমি নিজের মতো করে জীবনযাপন করতে চাই। আর সেই জায়গা থেকেই হয়তো বামদেবের মতো মানুষের জীবনকে বোঝার চেষ্টা করি।

FAQ

১. স্পিরিচুয়ালিটি বনাম রিলিজিয়সিটি: সব্যসাচী চৌধুরী ধর্মীয় আচারসর্বস্ব গোঁড়ামিতে বিশ্বাসী নন, তবে তাঁর কাছে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে; তিনি বৃহত্তর আধ্যাত্মিক অস্তিত্বে বিশ্বাসী।

২. চরিত্রের প্রভাব: দীর্ঘদিন টেলিভিশনে সাধক বামদেব ও রামপ্রসাদের মতো চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে প্রচুর পড়াশোনা ও চরিত্র অনুধাবনের মাধ্যমে তাঁর মধ্যে একটি দার্শনিক পরিবর্তন এসেছে।

৩. ঈশ্বরের কাছে চাওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি: সব্যসাচী জানিয়েছেন, তিনি মন্দিরে গিয়ে কখনো নিজের জন্য কিছু চান না। কারণ তাঁর মতে, "ঈশ্বর চাইলেই সব পাওয়া যায় না"—জীবনের এই কঠিন সত্যটি তিনি উপলব্ধি করেছেন।