সিনেমা ব্যবসা: ঈদনির্ভরতায় দমবন্ধ ঢালিউড

সিনেমা ব্যবসা: ঈদনির্ভরতায় দমবন্ধ ঢালিউড

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ব্যবসা এখন কার্যত ‘ঈদনির্ভর’ হয়ে পড়েছে। প্রতি ঈদে সিনেমা হলে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেলেও, ঈদ মৌসুমের বাইরে অধিকাংশ হল রীতিমতো জনশূন্য। টিকিটের যুদ্ধ হয় শুধু ঈদের সময়, অন্য সময়ে হলে ঢুকলে মনে হয়— কোনো ভূতের বাড়ি। প্রশ্ন হচ্ছে, বাকি সময়গুলোতে সিনেমা হল কীভাবে টিকে আছে?

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে তারই উত্তর জানার চেষ্টা করেছেন এই প্রতিবেদক-

খুলনার শঙ্খ সিনেমা হল পুরোনো সিনেমা চালিয়েই টিকে আছে। বর্তমানে চলছে শাকিব খানের ২০১৪ সালের ছবি রাজত্ব। হলটির ম্যানেজার রেজাউল করিম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, “ঈদে বরবাদ ও তাণ্ডব ভালো ব্যবসা দিয়েছে, সেই ব্যাকআপেই ক্ষতি পুষিয়ে নিচ্ছি। নতুন ভালো সিনেমার অভাব সবসময় থাকে। অনেক সময় পুরোনো শাকিব খানের সিনেমাতেও নতুনদের চেয়ে বেশি দর্শক আসে।”

অন্যদিকে, চট্টগ্রামের সুগন্ধা সিনেমা হল প্রায় এক মাস ধরে বন্ধ। ব্যবস্থাপক শাহাদত হোসেন জানান, “ঈদের পর ভালো সিনেমা নেই। মাঝেমধ্যে প্রচারণা ছাড়া যে সব ছবি আসে, সেগুলোতে দর্শক যায় না। ফলে হল চালিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।”

বগুড়ার মধুবন সিনেপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইকুজ্জামান ইউনুস বলেন, “এই সপ্তাহে ‘জ্বিন ৩’ চলছে, কিন্তু দর্শক নেই। এর আগে ‘উড়াল’ চালিয়েছিলাম সেখানেও দর্শক নেই। ঈদের পর আর ব্যবসা করতে পারিনি।”

সুগন্ধার মালিক জানান, স্টাফদের বেতন, করপোরেশন ট্যাক্সসহ মাসে ন্যূনতম ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। দর্শক না থাকলেও এই খরচ বহন করতে হয় নিজের পকেট থেকে। তিনি বলেন, “প্রতি মাসে অন্তত একটি ভালো সিনেমা মুক্তি পেলে দর্শক আসত। আর পুরনো সিনেমাতেও এখন দর্শক হলে আসে না, কারণ ইউটিউব ও ওটিটিতে ওইসব সিনেমা সহজে পাওয়া যাওয়ায় মানুষ হলে আসতে চায় না।”

একই সংকটের মুখে পড়েছেন কিশোরগঞ্জের রাজ সিনেমা হল–এর মালিক সাজু আহমেদ। তিনি জানান, ঈদের পর থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

বগুড়ার মধুবন সিনেপ্লেক্স–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইকুজ্জামান ইউনুস বলেন, “বছরে শুধু দুই ঈদেই সার্ভাইভ করতে পারি। ঈদের বাইরে সিনেমা আসছে ঠিকই, কিন্তু ব্যবসা করতে পারছে না। দর্শকরা আধুনিক কন্টেন্ট চায়—ভালো মিউজিক, ভিএফএক্স, গল্প। এগুলো দিতে না পারলে হল টিকবে না।”

২৬ বছরের ক্যারিয়ারে আড়াই শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন ঢাকাই সিনেমার শীর্ষ তারকা শাকিব খান। তার অভিনীত বহু ব্লকবাস্টার সিনেমা ঈদ ছাড়াই মুক্তি পেয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করতে এই নায়ক বছরে ৮/১০টি করে সিনেমা করা বাদ দিয়েছেন।

আগামীতেও ঈদ ছাড়া নিয়মিত সিনেমা করার কথা জানিয়ে শাকিব খান বলেন, ঈদ ছাড়াও যাতে ভালো সিনেমা উপহার দেয়া যায় সেই প্ল্যান করেছি। ফলে আগামীতে ‘সোলজার’ আসছে। আমার প্রডাকশন থেকেও ঈদ ছাড়া বড় বাজেটের সিনেমা আসবে। হাতে থাকা সিনেমাগুলো শেষ করে আগামীতে এসকে ফিল্মস কোলাবোরেশন করেও সিনেমা করবে। আমার জন্য বছরে তিনটি সিনেমাই যথেষ্ট। প্রতিটি সিনেমার আগে আমাকে সময় নিয়ে প্রস্তুত হতে হয়, লুকসহ ফিটনেসে পরিবর্তন আনতে হয়। এগুলো সময় সাপেক্ষ কাজ। ভালো সিনেমা দিতে পারলে ঈদ ছাড়াও সিনেমা হলে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। বিশেষ করে সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলো টিকিয়ে রাখতে হলে ঈদ ছাড়াও ভালো সিনেমা দিতে হবে।

ঈদ ছাড়াও সিনেমা আনছেন জানিয়ে সুড়ঙ্গ, তুফান, দাগি, তাণ্ডব-এর প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিল বলেন, ঈদ কেন্দ্রিক কয়েকটি মাত্র সিনেমার ওপর ভরসা করে কখনোই একটি ইন্ডাস্ট্রি টিকে থাকতে পারে না। বাংলা সিনেমার অগ্রগতি ও হলগুলোর টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আমাদের সারা বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে সিনেমা নির্মাণ ও মুক্তি দিতে হবে। আমরা আলফা-আই ইন্টারটেইনমেন্ট লি. ইতোমধ্যে বছরে চারটি থেকে পর্যায়ক্রমে ছয়টি সিনেমা মুক্তির পরিকল্পনা নিয়েছি। এবছর আমাদের ‘দাগি’ ও ‘তাণ্ডব’ মুক্তি পেয়েছে। ডিসেম্বরে একটি নতুন সিনেমা মুক্তির লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে চলছে। সবাইকে ঈদের বাইরেও সিনেমা নির্মাণে আগ্রহী হতে হবে- না হলে এই ইন্ডাস্ট্রি সার্ভাইভ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

‘বরবাদ’ প্রযোজনা করে আলোচনায় আসা প্রযোজক শেহরিন সুমিও জানালেন, ঈদ ছাড়াও তার প্রডাকশন হাউজ রিয়েল এনার্জি থেকে বছরে আরও দুটি সিনেমা নির্মাণ করতে চান। ২০২৬-এ তিনি ঈদ ছাড়া সিনেমা করে মুক্তি দেবেন। কিন্তু প্রথমবার ‘বরবাদ’ বানিয়ে মুক্তির পর সিনেমার হলে উপচে পড়া দর্শক উপস্থিতির পরেও ‘টাকা ফেরত পাওয়া’ নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন শেহরিন সুমি।

প্রযোজক শেহরিন সুমি বলেন, ঈদে ‘বরবাদ’ এতো ভালো চলার পরেও প্রযোজক হিসেবে ঠকানো হয়েছে, ব্রেক ইভেনে যেতে সময় লেগেছে যেটা কাম্য ছিল না। কারণ, সিনেমা হল থেকে প্রচুর অর্থ চুরি হয়েছে, এতে করে হয়রানীর শিকার হয়েছি। এখনও কিছু হলে কয়েক লাখ টাকা পাই। এদের মধ্যে কেউ দুই লাখে সিনেমা নিয়ে ১৭/১৮ লাখ টাকার লাভ করেছে কিন্তু প্রযোজকের প্রাপ্যটা ফেরত দেয়নি। ‘বরবাদ’ সিনেমা হলে এতো ভালো চলার পরেও আমাকে আক্ষেপ নিয়ে এগুলো বলতে হচ্ছে। যদি ব্যবসায় স্বচ্ছতা পেতাম, তাহলে তো এতোদিনে নতুন সিনেমা শুরু করে দিতাম।

সরকারি হস্তক্ষেপের কথা জানিয়ে তিনি বলেন,“হল মালিক, বুকিং এজেন্টকে প্রোপার শেয়ার মানি ও ঈদের মতো বুকিং মানি দিতে হবে। বরবাদের চেয়েও বড় সিনেমা বছরে একটি করে হলেও আনতে চাই, কিন্তু প্রথম সিনেমায় এনালাইসিস করে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। এই সমস্যা দূর করতে সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”

দেশের অন্যতম মাল্টিপ্লেক্স চেইন স্টার সিনেপ্লেক্স। প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা মেজবাহ আহমেদ বলেন, “আমাদের হল মালিকদের কথা কেউ চিন্তা করে না। সবাই ঈদ কেন্দ্রীক তাদের সিনেমার কথাই চিন্তা করে, শুধু মাত্র ঈদ নির্ভরতার কারণে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি আজ এতো সংকীর্ণ অবস্থায় এসে ঠেকেছে। অথচ কয়েক বছর আগেও এই কালচার ছিলো না, বছরের অন্য সময়েও কয়েকটা সিনেমা আসতো; যা দিয়ে হল মালিকরা অন্তত বেঁচে থাকতে পারতো। কিন্তু গত ৩/৪ বছর ধরে দেখছি, অনেক কন্টেন্ট থাকে- কিন্তু সবাই ঈদে রিলিজ দেয়ার জন্য বসে থাকে। এতে তাদেরও ক্ষতি হয়, কেননা একসাথে এতো সিনেমা আসলে হল কমে যায়, শো কমে যায়। দুই তিন মাস হয়তো ভালো ব্যবসা হয়, কিন্তু বাকি ৯/১০ মাস হল মালিকরা কীভাবে চলেন, কতো ভর্তুকি দিয়ে হল চালু রাখতে হয়- এ বিষয়টা কেউ দেখেন না। তারা শুধু ঈদের সময়ে হল মালিকরা কতো বেনিফিট করছে, বা কতো শেয়ার নিয়ে নিচ্ছে- সেটা বলেন, কিন্তু তারপরে সারা বছর আমরা যে কীভাবে সারভাইব করি, সেটা কেউ বিবেচনা করেননা। আমাদের কথা স্পষ্ট যে, আপনারা শেয়ার মানি নেন, কিন্তু সারা বছর আমাকে অন্তত ৪/৫টা কন্টেন্ট তো দিবেন। না হলে আমি সারভাইভ করবো কীভাবে?”

“আমাদের এখানে বাংলা মুভির দর্শক বেশী। কিন্তু সারা বছর মানসম্মত নতুন ছবি আমরা দর্শকদের দিতে পারি না। প্রতি ঈদে ৬/৭টা ভালো সিনেমা রিলিজ হয়, এটা কারো জন্যই ফ্রুটফুল নয়। এগুলো যদি ঈদের পরে ধাপে ধাপে রিলিজ হতো, অন্তত মাসে একটা ভালো সিনেমা যদি দেয়া যেতো- তাহলে সবার জন্যই বেটার হয়। অন্তত যারা সিনেমা নির্মাতা, প্রযোজক আছেন- তারা নিজেদের স্বার্থের পাশাপাশি হল মালিকদের স্বার্থও যেন দেখেন।”

ঈদ ছাড়াও ভালো কন্টেন্ট হলে দর্শক সিনেমা হলে যায়, তেমন কিছু উদাহরণ দিয়ে মেজবাহ বলেন, “আমাদের অনেক ছবি আছে, যেগুলো ঈদে রিলিজ পায়নি; কিন্তু মানসম্মত কন্টেন্ট আর প্রচারণার ফলে উপচেপড়া দর্শক আমরা দেখেছি। আয়নাবাজি, ঢাকা অ্যাটাক, দেবী কিংবা হাওয়ার মতো সিনেমাগুলো সুপারহিট হয়েছে। সিনেমাগুলো নিয়ে দর্শক উন্মাদনা আমরা দেখেছি, অথচ এই একটি সিনেমাও কিন্তু ঈদে রিলিজ হয়নি। এজন্যই সবার উদ্দেশে আমরা বলি, সিনেমা ঈদের জন্য রেখে না দিয়ে সারা বছর ধাপে ধাপে ঠিকঠাক প্রমোশনে মুক্তি দিন। তাতে সবারই বেনিফিট হবে।”