Advertisement

অস্বস্তিতে শোবিজ শিল্পীরা

জনকণ্ঠ

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

অস্বস্তিতে শোবিজ শিল্পীরা
অস্বস্তিতে শোবিজ শিল্পীরা

বাংলাদেশের বিনোদন শিল্প ধারণাগতভাবে সিনেমা, গান, নাটকের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক জীবন্ত পরিবেশ। এখানে সৃষ্টিশীলতা ও সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি মাঝেমধ্যে বিতর্কের নামেও খবর হয়। কিন্তু সম্প্রতি দেখা গেছে যে, সাধারণ বিতর্কগুলো অনেক সময় গুজব ও ‘মিডিয়া ট্রায়াল’-এ পরিণত হচ্ছে, যা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা পুরো শিল্পক্ষেত্রকে করছে নিন্দিত। আর সেটি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। একটি গুজব বা ভুল খবরের কারণে শিল্পীর জীবনে নেমে আসতে পারে হতাশা, ক্ষোভ ও নিগ্রহ। বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে...
সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে, বিশেষ করে ফেসবুকের বদৌলতে বিনোদন জগতের শিল্পীরা এখন দর্শকের হাতের মুঠোয়। শিল্পীরা কোথায় যাচ্ছেন, কখন কী করছেন, কী খাচ্ছেন, এসবসহ আরও অনেক কিছুই ভক্ত, অনুরাগী কিংবা সাধারণ মানুষ গণমাধ্যমের আগে ফেসবুক কিংবা ইউটিউবের মাধ্যমে পেয়ে যাচ্ছেন। এর অনেকটা শিল্পীরা নিজেরাই শেয়ার করেন, আবার খানিকটা ইউটিউবাররা প্রকাশ করেন। ফলে শিল্পীদের নিয়ে গুজবও তৈরি হয় হরহামেশা। সেই গুজব কখনো কখনো মিডিয়া ট্রায়ালে রূপ নেয়। মিডিয়া ট্রায়াল বলতে বোঝায় এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া কোনো ঘটনা, অভিযোগ বা মামলা নিয়ে এতটা প্রচার করে যে, অভিযুক্তকে দোষী বলে ধরে নেওয়া হয়, আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি আইনের শাসনকে অগ্রাহ্য করে জনমতের ওপর ভিত্তি করে বিচার চালানোর প্রবণতা সৃষ্টি করতে পারে। যেমনটা অতীতে রাষ্ট্রীয় অনেক ঘটনায় দেখা গেছে।
এটা ঠিক যে, সোশ্যাল মিডিয়ার ঘন উপস্থিতি বিনোদন জগৎকে অনেকটা খুলে দিয়েছে। সঙ্গে গুজবের রাস্তাও প্রশস্ত করে দিয়েছে। এটি এমন একটি দ্বিধাগ্রস্ত মাধ্যম, যেখানে তথ্যের সঙ্গে সঙ্গে ভুল এবং ভিত্তিহীন কনটেন্টও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকবার দেখা গেছে, কোনো অভিনেতা অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত জীবনের কোনো ঘটনা ভিডিওসহ ভাইরাল হয়ে বেশ বিতর্ক তৈরি করেছে। আবার কখনো কোনো শিল্পীর সমালোচনামূলক মন্তব্যকে অতিরঞ্জিত করে বোঝানো হয়, যেন তা কোনো বড় অনৈতিক কাজ। এ ধরনের গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বিনোদন অঙ্গনের মানুষদের নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ভুল ধারণা তৈরি হয়, যা সমাজে বিভ্রান্তি ও বিভেদ সৃষ্টি করার সম্ভাবনা রাখে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুজব শুধু বিনোদন শিল্পকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, এর প্রভাব আরও বিস্তৃত। এটি বড় সামাজিক ইস্যুতে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরির পথও খুলে দেয়। শুধু তাই নয়, এটি যে শিল্পীর ক্ষেত্রে ঘটছে তার সামাজিক তো বটে, মনস্তাত্ত্বিক জীবনেও বেশ প্রভাব ফেলে। অনেকে হতাশায় আক্রান্ত হন।
দেশে অসংখ্যবার অনেক অভিনয়শিল্পী কিংবা সংগীতশিল্পী, কলাকুশলী এই গুজব ও মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হয়েছেন। অনেকে এর পরিণতির কথাও বলেছেন। তারা জানান, কোনো বিতর্কের খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে তা সহজেই টকশো, নিউজ সাইট এবং ধারাবাহিক কমেন্ট ক্যাম্পেনে ঢুকে পড়ে। এতে করা কথাগুলো দাবি হিসাবে নেওয়া হয়, এবং পরে সত্য উদঘাটনের আগেই অনেকের ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রসঙ্গক্রমে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা উল্লেখ করে এক অভিনেত্রী বলেছেন, ‘আমাদের জীবনে কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত কিছু ভুল বোঝাবুঝিও ঘটে থাকে। কিন্তু যখন তা জনসাধারণের সামনে একটা অপরাধের মতো উপস্থাপন করা হয়, তখন তা শুধু আমাদের নামে নয়, পুরো ইন্ডাস্ট্রির সুনামের ক্ষতি করে।’
গুজব বা মিডিয়া ট্রায়াল কাজের ক্ষেত্রে কতটা বিরক্তিকর, জানতে চাইলে চিত্রনায়িকা বর্ষা বলেন, ‘আমি বহুবার দেখেছি, কোনো শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের ভিডিও বা গল্প সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে তা কোনো সত্যতা যাচাই ছাড়াই খবরের শিরোনাম হয়ে যায়। এরপর প্রায় প্রতিদিন সংবাদে উঠে আসে। ফলে আমার প্রফেশনাল কাজ নয়, আমার জীবনের ভুলটা নিয়েই ফোকাস চলে যায়।’ তার মতে, এসব গুজব এবং ভুল ব্যাখ্যা মিডিয়া ট্রায়ালে রূপান্তরিত হলে শিল্পীর মানসিক চাপ বাড়ে, পেশার প্রতি উৎসাহ কমে যায়।
একই সুরে বলেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা আবদুন নূর সজল। তিনি বলেন, ‘কোনো মন্তব্যকেই খ-িত আকারে প্রকাশ করা উচিত নয়। বক্তা কী বলতে চেয়েছেন, তা বুঝে তারপর তার মন্তব্য প্রকাশ করা উচিত। শিল্পীদেরও উচিত কোনো বিষয়ে সঠিক ধারণা না থাকলে সে বিষয়ে মতামত না দেওয়া বা মন্তব্য না করা। এতে করে সবার মাঝে ভুল বার্তা যায়। আর এ সুযোগটাই নেয় অপপ্রচারকারীরা। গুজব বা মিডিয়া ট্রায়াল যে কারোই মনোজগতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।’ অনেকে জানিয়েছেন, গুজবের কারণে শিল্পীরা হয়রানি এবং মানহানির শিকার হচ্ছেন।
যদিও গুজব, মিডিয়া ট্রায়াল শুধুই বিনোদন শিল্পে বিদ্যমান নয়। রাজনীতি, নাগরিক সমাজসহ দেশের প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব দেখা গেছে। কিন্তু বিনোদন ক্ষেত্রে এটি খুব স্পর্শকাতর, কারণ এখানে ব্যক্তির নাম-খ্যাতি ও জনমানসে ছড়ানো ভুল তথ্য সহজেই শিল্ড-ভক্তদের আস্থা ও দর্শকের অনুভূতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তাহলে এ গুজব বা মিডিয়া ট্রায়াল থেকে শিল্পীদের বাঁচার উপায় কী? বিশেষজ্ঞতের মতে, সংবাদকর্মী, ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের উচিত তথ্য যাচাই করে ভুল তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও মিডিয়া ট্রেনিং প্রোগ্রামে ‘মিডিয়া লিটারেসি’ শেখানো প্রয়োজন, যাতে নাগরিকরা গুজব চিনতে শেখে, ভ্রান্তি ও প্রমাণভিত্তিক সাংবাদিকতার পার্থক্য বুঝতে পারে এবং সঠিক আইনি কাঠামো ও দ্রুত তথ্য যাচাই ও প্রতিকার ব্যবস্থা থাকলে বর্তমান গুজব ও মিডিয়া ট্রায়ালকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
বাংলাদেশে বিনোদন শিল্প যেমন আনন্দ ও সৃজনশীলতার কেন্দ্র তেমনি একে সত্য হিসাবে উপস্থাপন করার দায়িত্বও সবার, মিডিয়া, শিল্পী ও সাধারণ জনগণের। গুজব ও মিডিয়া ট্রায়াল যদি এভাবে চলতে থাকে, তাহলে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামগ্রিক শিল্প সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হবে। তাই তথ্যভিত্তিক, ইনসাফ ও দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে তোলা দরকার, যেখানে সঠিক সংবাদই হবে নাগরিক মুক্তির সোপান।
‘কোনো মন্তব্যকেই খ-িত আকারে প্রকাশ করা উচিত নয়। বক্তা কী বলতে চেয়েছেন, তা বুঝে তারপর তার মন্তব্য প্রকাশ করা উচিত। শিল্পীদেরও উচিত কোনো বিষয়ে সঠিক ধারণা না থাকলে সে বিষয়ে মতামত না দেওয়া বা মন্তব্য না করা। এতে করে সবার মাঝে ভুল বার্তা যায়। আর এ সুযোগটাই নেয় অপপ্রচারকারীরা। গুজব বা মিডিয়া ট্রায়াল যে কারও ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে।’

আরও পড়ুন

Lading . . .