Advertisement

দেশের কর্মক্ষম মানুষের ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের কাজে, থাকে না নিয়োগপত্র

প্রথম আলো

প্রকাশ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬

দেশের কর্মক্ষম মানুষের ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। এ সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। স্নাতক বা তার চেয়ে বেশি শিক্ষিত ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশের বেশি চাকরি না পেয়ে অনানুষ্ঠানিক কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব কাজে তাঁদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের আয়ের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ কম।

বিশ্বব্যাংকের করা ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর জেম মেতে, সংস্থাটির এশিয়ার অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকা লিজেলোটে ওনসর্গ এবং বাংলাদেশ ও ভুটানের অপারেশনস ম্যানেজার গেইল মার্টিন।

বিশ্বব্যাংক বলছে, অনানুষ্ঠানিক খাতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের চাকরির নিয়োগপত্র থাকে না। ফলে তাঁদের আইনি সুরক্ষা থাকে না বললেই চলে। অনানুষ্ঠানিক খাতে নির্ধারিত কোনো মজুরিকাঠামোও নেই। ফলে তাঁদের আয়ও কম। এ ছাড়া অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির গতিও কম। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে এ হার অর্ধেক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে ২০৪৫ সালে। এরপর কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হার কমতে শুরু করবে। তার বিপরীতে বাড়বে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। তাই জনমিতির সুবিধা কাজে লাগাতে বাংলাদেশের হাতে সময় আর বেশি নেই। অথচ কর্মসংস্থান তৈরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনো দুর্বল। ফলে ধনী হওয়ার আগেই বয়স্ক সমাজে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ।

বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ বলছে, অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ছোট উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছেন। ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, বিকল্প বা নিয়মিত চাকরি না পেয়ে তাঁরা এ ধরনের উদ্যোগ শুরু করেছেন।

অনানুষ্ঠানিক খাতকে আমাদের নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। প্রচলিত ধারণায় অনানুষ্ঠানিক খাতকে অনুন্নত মনে করা হয়। আমার মতে এটি ভেঙে দেখা দরকার।
হোসেন জিল্লুর রহমান, নির্বাহী চেয়ারম্যান, পিপিআরসি

জনসংখ্যার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষম মানুষের ওপর নির্ভরশীল মানুষের চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার চাহিদাও বাড়বে। কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি এখনো দুর্বল।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার মাত্র ৩৬ শতাংশ। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এটি সর্বনিম্ন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় এ হার গড়ে ৬২ শতাংশ। জনসংখ্যা বয়স্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা বাড়বে। কিন্তু এ খাতে বাংলাদেশের ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলেছে, সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের মাত্র ২ শতাংশ পায় দরিদ্র শিশুরা। প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষার অবস্থাও দুর্বল।

বাংলাদেশে সরকারি বয়স্ক ভাতা মাসে মাত্র ৫০০ টাকা। মূল্যস্ফীতির কারণে এ ভাতা দারিদ্র্যসীমার তুলনায় অনেক কম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের চেয়ে শ্রমের জোগান ১ কোটি ৩০ লাখ বেশি হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের সবার জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব না-ও হতে পারে। এ কারণে আগামী দুই দশককে জনমিতিক সুযোগ কাজে লাগানোর গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর এ বিষয়ে একটি প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ এবং বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর জেম মেতে।

এ সময় সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘জনমিতির ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সরকার পুরো জীবনচক্রভিত্তিক পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবার জন্য কর্মসূচিগুলো আমরা বিস্তৃত করছি। আমাদের লক্ষ্য, তরুণ প্রজন্ম যেন স্বাস্থ্যবান ও দক্ষ হয়ে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।’

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা ৪ কোটিতে পৌঁছে যাবে। এ বিশাল জনসংখ্যার জন্য একটি নতুন পরিকল্পনা প্রয়োজন। তাদের জন্য একটি বার্ধক্যজনিত স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলাও সরকারের লক্ষ্য। এ ছাড়া তরুণদের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। না হলে জনমিতির সুবিধা নেওয়া সম্ভব হবে না।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘অনানুষ্ঠানিক খাতকে আমাদের নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। প্রচলিত ধারণায় অনানুষ্ঠানিক খাতকে অনুন্নত মনে করা হয়। আমার মতে, এটিকে ভেঙে দেখা দরকার। তা না হলে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগগুলো কোথায় তৈরি হচ্ছে এবং সেগুলোকে কীভাবে এগিয়ে নিতে হবে, তা আমরা বুঝতে পারব না।’

Lading . . .