আর্কিটেকচারেও যে স্পিরিচুয়ালিজ়ম মেশানো যায়, শিখিয়েছিলেন যোগেনদা-ই
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
পেশার তাগিদে এবং বন্ধুদের আবদারে অনেক বাড়ির নকশাই আমি এঁকেছি। তবে যোগেনদার সাধের ‘স্বাদ’ তৈরি করতে গিয়ে আমি যা কিছু শিখেছি, সেটা দেশ-বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরেও অর্জন করতে পারিনি। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, আমার পড়াশোনা এবং কাজের অনেকটা জুড়েই তিনি রয়েছেন। শিবপুর বি.ই. কলেজ থেকে আর্কিটেকচার নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করার পরে মাস্টারক্লাস করেছি অস্ট্রেলিয়ায় — গ্লেন মার্কটের কাছে। জাপানে কিয়োটোয় জাপানিজ় গার্ডেনের স্থাপত্যশৈলী নিয়েও একটু পড়াশোনা করতে গিয়েছি পরবর্তীকালে। আর্কিটেকচার নিয়ে আমার উচ্চশিক্ষা যতটুকু হয়েছে, তার ইন্সপিরেশন হলেন যোগেন চৌধুরী।
যোগেনদা ‘শান্তিনিকেতন সোসাইটি অফ ভিস্যুয়াল আর্ট অ্যান্ড ডিজ়াইন’-এর সেক্রেটারি ছিলেন। সেই সূত্রে ওঁর বাড়িতে আমার মতো অনুজদের যাতায়াত লেগেই থাকত। শ্যামবাটিতে যোগেনদার ছোট একটা বাড়ি ছিল। আর তার পাশেই ছিল লীলা মজুমদারের বাড়ি। পরে যোগেনদা ওই বাড়িটা কিনে নেন। ঠিক হয়, লীলাদির পুরোনো বাড়িতেই উনি থাকবেন। তখনই আমার ডাক পড়ে।
ওঁর আবদার ছিল, পুরোনো স্ট্রাকচারটি মোটের উপর অপরিবর্তিত রেখে সামান্য কিছু অদলবদল করার। সেই গুরুভার উনি আমার কাঁধেই তুলে দিয়েছিলেন। তখন উপলব্ধি করেছিলাম, যোগেনদা শুধু একজন পেন্টার নন, আর্কিটেকচার বা স্থাপত্যবিদ্যার প্রতিও ওঁর প্রচণ্ড আগ্রহ। কাজ করতে করতে দেশ-বিদেশের স্থাপত্য নিয়ে গল্প হতো। ফ্রান্সে থাকাকালীন ওখানকার বেশ কিছু পুরোনো বাড়ির ডিজ়াইন যোগেনদার বেশ মনে ধরেছিল। সেটা ছবি আঁকার ক্ষেত্রে ওঁকে কতটা প্রভাবিত করেছিল জানি না, তবে নিজের বাড়ির ডিজ়াইন করতে গিয়ে বার বার সেই প্রসঙ্গ উঠে আসত। এমনই ব্যাপ্তি ছিল যোগেনদার।
ওঁর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছিলাম, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ কিংবা বিদেশে থেকে যে ডিগ্রি আমি অর্জন করেছি, যোগেনদা এ সব কিছুর ঊর্ধ্বে। পরবর্তীকালে যখন লীলাদির বাড়িটা যোগেনদা কিনলেন, তখন আবার আমার ডাক পড়ল। উনি আমাকে জানালেন, লীলাদির পুরোনো বাড়িটাতেই থাকবেন। এবং আমি যেন মূল বাড়িটাকে অপরিবর্তিত রেখে দু’টি বাড়িকে একসূত্রে বেঁধে ফেলার কাজ শুরু করি। মজার কথা হলো, ফ্রান্সের স্থাপত্যশৈলী ওঁর পছন্দের বিষয় হলেও ভারতীয় বাস্তুশাস্ত্র নিয়ে যোগেনদার আগ্রহের শেষ ছিল না। আমাকে বলেছিলেন, এই দু’টি বিষয় বজায় রেখেই বাড়ির ডিজ়াইনটা করতে।
লীলা মজুমদারের বাড়িটায় একটা বসার জায়গা ছিল — পোর্টিকো মতো। সেটার তিন দিক খোলা। আর একটা দিকে কয়েকটা ঘর ছিল। সেখানে বেশি কিছু চেঞ্জ না করে তার সঙ্গে একটা করিডর কানেক্ট করে আর একটা নতুন বাড়ি করা হলো জমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে। ‘স্বাদ’-এর সদস্যরা বেশির ভাগই ছিলেন কলাভবনের প্রফেসর। সকলে আলোচনা করেই একটু একটু করে যোগেনদার বাড়িটা সাজিয়ে তুলেছিলাম আমরা।
একটা জিনিস আমার খুব ভালো লাগত। সেটা হলো যোগেনদার হ্যান্ডস্কেচ। মানে, বাড়ির ডিজ়াইন কেমন হবে, কী হবে — সবটাই তিনি হাতে এঁকে বুঝিয়ে দিতেন। শুধু তা-ই নয়, একেবারে পেন্টিং-এর মতো ডকুমেন্টেশন করে রাখতেন। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল পাবলো পিকাসোর একটা ঘটনার কথা। ওঁকে নিয়ে একটা গল্প বেশ প্রচলিত। একবার কোনও এক ছুতোরমিস্ত্রিকে একটি আলমারি তৈরির বরাত দিয়েছিলেন পিকাসো। নিজে হাতে সেই আলমারির ডিজ়াইন এঁকে দিয়েছিলেন। খরচ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই মিস্ত্রি নাকি পাবলোকে বলেছিলেন, ‘কিছু লাগবে না। শুধু আপনার হাতে আঁকা ওই স্কেচের তলায় একটা সই করে দিলেই হবে।’
বিশ্বভারতীর কলাভবনে ছাত্রছাত্রী ছাড়া অন্যদের প্রবেশের অনুমতি ছিল না। কিন্তু যোগেনদা চাইতেন এমন একটা আর্ট সোসাইটি হোক, যেখানে শান্তিনিকেতনের বাইরে থাকা ছেলেমেয়েরা কিংবা শিল্প অনুরাগীরাও আসতে পারেন। শিল্পকে যেন একেবারে তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেই চিন্তা সবসময়ে ওঁর মাথায় ঘুরে বেড়াত। যোগেনদা সব সময়ে বলতেন, আর্কিটেকচারের মধ্যে স্পিরিচুয়ালিজ়ম থাকা উচিত। তখন এ সব কথার মানে ঠিক বুঝতাম না। পরে এই বিষয়টা নিয়ে ভাবতে শুরু করি। স্পিরিচুয়ালিজ়ম বিষয়টাকে শুধু ধর্মীয়স্থানে আবদ্ধ না রেখে কী ভাবে স্থাপত্যের মধ্যে মিশিয়ে দেওয়া যায়, সেই ধারণা আমাকে দিয়েছিলেন যোগেনদা-ই।
যোগেনদার বাড়ির দোতলায় ১৮ ফুট লম্বা একটা স্কাইলাইট ছিল। আমি চেয়েছিলাম সেখানে ওঁর হাতে আঁকা একটা পাখি থাকবে, যার ছায়া ওই স্কাইলাইটের মধ্যে দিয়ে মেঝের উপর এসে পড়বে। এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে ওই ছায়াটা নড়াচড়া করবে। এটা নিয়ে আমি যোগেনদার সঙ্গে কথাও বলেছিলাম। উনি বলেছিলেন এঁকে দেবেন। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠল না। এই আক্ষেপটা থেকেই গেল।


