নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কাটা হচ্ছে হাজারো গাছ
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঝিনাইদহ-কোটচাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। বন বিভাগ বলছে, আড়াই বছর আগে গাছগুলো কাটার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এরপর কার্যাদেশ দেওয়া হয়, কিন্তু নানা কারণে গাছগুলো এত দিন কাটা হয়নি। এখন কাটা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সের রেইনট্রি, মেহগনি, আকাশমণিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কাটা চলছে। গাছগুলো বৃহৎ আকৃতির, ঘন সবুজ ও তরতাজা। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ-জীবননগর সড়কের কোটচাঁদপুর এলাকার কাশিপুর থেকে শুরু করে এলাঙ্গী অভিমুখে মহাসড়কের দুই ধারের গাছ কাটা চলছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু গাছ কাটা হয়েছে। কিছু গাছের ডাল কেটে ফেলা হয়েছে। কিছু গাছ কেটে রাস্তার ধারে ফেলে রাখা আছে। এখনো গাছ কাটা অব্যাহত রয়েছে।
তরতাজা গাছগুলো কেন কাটা হচ্ছে, তা এলাকাবাসীর বোধগম্য নয়। এগুলো রাস্তায় চলাচলকারী মানুষের ছায়া দিচ্ছে, নির্মল অক্সিজেন দিচ্ছে। তা ছাড়া গাছগুলোর অনেক মূল্য, সেখানে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে। দুই বছর আগের দরপত্র এত দিন কীভাবে বহাল থাকল, সেই দরপত্রে এখন কীভাবে গাছ কাটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।রেজাউল ইসলাম, কোটচাঁদপুরের এলাঙ্গী এলাকার বাসিন্দা
বন বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গাছগুলো কাটার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় সারা দেশে সবুজ তরতাজা গাছ না কাটার নির্দেশ দেয়। এরপর কোটচাঁদপুর ও শৈলকুপার গাছগুলো কাটা বন্ধ হয়ে যায়। এখন পুরোনো দরপত্রে নতুন করে গাছ কাটা হচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কোটচাঁদপুরে ৪৫টি লটে এবং শৈলকুপায় ছয়টি লটে গাছ বিক্রি করা হয়েছে। বন বিভাগের কার্যাদেশে গাছের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। শুধু লট উল্লেখ করা হয়েছে এবং বিক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ৩৫ লাখ ৫২ হাজার ২৫ টাকা। ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল সামাজিক বন বিভাগের যশোর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে এই দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০২৪ সালের ২০ জুন কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে মেসার্স আর কে এন্টারপ্রাইজের নামে, যার মালিক হিসেবে নাম উল্লেখ রয়েছে কুষ্টিয়ার মৃত আবুল কাশেমের ছেলে বকুল হোসেনের। তবে সরেজমিনে গাছ কাটা দেখভাল করছেন কালীগঞ্জের কাঠ ব্যবসায়ী আক্কাচ আলী। মূল কার্যাদেশপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আক্কাচ আলীর ভাষ্য, কুষ্টিয়ার এক ঠিকাদার গাছগুলো দরপত্রের মাধ্যমে ক্রয় করেছেন। তাঁর কাছ থেকে তিনি গাছ কিনে নিয়ে কাটছেন। সরকারি সব নিয়ম মেনেই গাছ কাটা হচ্ছে বলে দাবি আক্কাচের।
বন বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, একটি লটে ২০ থেকে ২৫টি গাছ রয়েছে। এভাবে কোটচাঁদপুরে ৪৫টি লটেই হাজারের অধিক গাছ কাটা পড়বে। এ ছাড়া শৈলকুপা উপজেলায়ও ছয়টি লটে গাছ কাটা হচ্ছে। সেখানেও ইতিমধ্যে গাছ কাটা শুরু হয়েছে।
কোটচাঁদপুর উপজেলার এলাঙ্গী এলাকার বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম বলেন, তরতাজা গাছগুলো কেন কাটা হচ্ছে, তা এলাকাবাসীর বোধগম্য নয়। এগুলো রাস্তায় চলাচলকারী মানুষের ছায়া দিচ্ছে, নির্মল অক্সিজেন দিচ্ছে। তা ছাড়া গাছগুলোর অনেক মূল্য, সেখানে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা হয়েছে। দুই বছর আগের দরপত্র এত দিন কীভাবে বহাল থাকল, সেই দরপত্রে এখন কীভাবে গাছ কাটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছে না। ইতিমধ্যে বেশ কিছু জায়গা থেকে গাছগুলো কেটে নেওয়ায় মহাসড়ক ফাঁকা হয়ে গেছে। ছায়া-শীতল অবস্থা হারিয়ে গেছে।
ঝিনাইদহ জেলা সহকারী বন সংরক্ষক মোছা. জুমুয়া জামান অল্প দিন এই জেলায় এসেছেন। ফলে গাছগুলো কাটার দরপত্রের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাতে পারেননি।
এ বিষয়ে বন বিভাগ কোটচাঁদপুরের ডেপুটি বন রেঞ্জার প্রণব কুমার বিশ্বাস জানান, গাছগুলো অনেক আগে দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছে। মাঝে নানা কারণে কাটা সম্ভব হয়নি। এখন কাটা হচ্ছে।
প্রণব কুমার বলেন, সামাজিক বনায়ন প্রকল্পে এই গাছগুলো লাগানো ছিল। এ প্রকল্পের একটা মেয়াদ থাকে, সেই মেয়াদ শেষে বিক্রি করার নিয়ম রয়েছে। কত বছর মেয়াদ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১০ বছর থেকে শুরু করে ২৫-৩০ বছরও হতে পারে। বর্তমানে যে গাছগুলো কাটা হচ্ছে, সেগুলো ২০ থেকে ২৫ বছর মেয়াদের বলে তাঁদের ধারণা।


