বিয়ের দিনে বরের জানাজা, শোকে স্তব্ধ দুই পরিবার
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
আজ শুক্রবার বাদ জুমা বিয়ে হওয়ার কথা ছিল তরুণ প্রকৌশলী আরিফ শাহরিয়ারের। আগামীকাল শনিবার দুপুরে বউভাতের আয়োজনও ঠিক ছিল। কিন্তু বিয়ের আগের দিন গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তিনি মারা গেছেন। আলোকসজ্জায় সাজানো বর ও কনের দুই বাড়িতেই নেমে এসেছে শোক।
গতকাল রাত পৌনে আটটার দিকে মারা যাওয়া আরিফ (২২) গাইবান্ধা শহরের ডেভিড কোম্পানিপাড়ার বাসিন্দা। কনের বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় এলাকায়।
পরিবার ও এলাকাবাসী জানান, আরিফ সম্প্রতি ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তিনি চাকরি করতেন। বিয়ের জন্য প্রায় এক মাস আগে ঢাকা থেকে বাড়িতে আসেন। বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার পর থেকে বর ও কনের দুই বাড়িতেই প্রস্তুতি চলছিল। বর বরণের জন্য কনের বাড়ির ফটক ও ঘর সাজানো হয়েছিল। দাওয়াতপত্রও বিলি করা হয়েছিল।
গতকাল রাতে আরিফের গায়েহলুদের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই সময় তাঁর নিথর দেহ রাখা ছিল গাইবান্ধা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের কফিনে। ডেভিড কোম্পানিপাড়ায় অবস্থিত স্বেচ্ছাসেবী এই সংগঠনের পরিচালক কায়সার প্লাবন বলেন, আগামীকাল দুপুরে কমিউনিটি সেন্টারে বউভাতের কথা ছিল। সবকিছু পণ্ড হয়ে গেল নিমেষে।
আরিফ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে ধারণা পরিবারের। আরিফের একমাত্র বড় বোন শারমিন সুলতানা শহরের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে তাঁর ভাইয়ের চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি জানান, চার দিন আগে আরিফ জ্বরে আক্রান্ত হন। শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে গতকাল সকাল নয়টার দিকে তাঁকে শহরের হাসপাতাল রোডের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়া হয়। শারমিনের অভিযোগ, সেখানে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখার পর বেলা একটার দিকে একজন চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দেন। ওষুধ নিয়ে আরিফকে বাড়িতে আনা হয়।
বিকেলে আরিফের অবস্থা আরও খারাপ হয়। সাড়ে পাঁচটার দিকে তাঁকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। শারমিনের অভিযোগ, সেখানে জরুরি বিভাগের সামনে প্রায় এক ঘণ্টা তাঁকে রিকশায় বসে থাকতে হয়। পরে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক দেখেন। রাত পৌনে আটটার দিকে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাজমুল হুদা। আজ শুক্রবার সকালে মুঠোফোনে পরিবারের বরাত দিয়ে বলেন, আজ দুপুরে প্রকৌশলী আরিফের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। গতকাল রাতেই তিনি মারা যান। তবে ঠিক কী কারণে মারা গেছেন, তা জানা যায়নি।
বিষয়টি নিয়ে গাইবান্ধা শহরের হাসপাতাল রোডের মাইশা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক কাইয়ুম মিয়ার সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। মুঠোফোনে কাইয়ুম বলেন, ‘আরিফ শাহরিয়ার আমার পরিচিত। আজ শুক্রবার দুপুরে তাঁর বিয়ের দাওয়াত আমাকেও দিয়েছিলেন। তাঁকে বৃহস্পতিবার দুপুরে আমাদের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসার জন্য আনা হয়। চিকিৎসক মনির হোসেন তাঁকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। তারপরও হাসপাতালে ভর্তি না করে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে সন্ধ্যায় তাঁকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।’
বৃহস্পতিবার রাতে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছিলেন চিকিৎসক মেহেদী হাসান। তিনি আজ সকালে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই রোগীকে (আরিফ শাহরিয়ার) হাসপাতালে মৃত অবস্থায় আমরা পাই। সাধারণত জ্বরে হঠাৎ করে মারা যাওয়ার কথা নয়। আত্মীয়স্বজনের কাছে তাঁর বর্ণনা শুনে এবং আগের রিপোর্ট দেখে বোঝা গেছে, তিনি বেশ কয়েক দিন ধরে টাইফয়েডে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর ডেঙ্গুর উপসর্গ ছিল না। সম্ভবত তিনি স্ট্রোক বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।’
আজ বাদ জুমা গাইবান্ধা শহরের রেলস্টেশন জামে মসজিদে আরিফ শাহরিয়ারের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর শহরের পৌর কবরস্থানে তাঁর দাফন হয়।


