Advertisement

আশিকুরের কাছে গানই জীবন, গানই যেন প্রাণ

প্রথম আলো

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট, ২০২৫

প্রতিদিন সন্ধ্যায় গাইবান্ধার একটি রিসোর্টে সংগীত পরিবেশন করেন আশিকুর রহমানছবি: প্রথম আলো
প্রতিদিন সন্ধ্যায় গাইবান্ধার একটি রিসোর্টে সংগীত পরিবেশন করেন আশিকুর রহমানছবি: প্রথম আলো

গান ছাড়া আশিকুর রহমান (২৮) থাকতে পারেন না। প্রতিদিন সন্ধ্যা হলে গাইবান্ধা সদর উপজেলার রাধাকৃষ্ণপুর গ্রামের এই তরুণ লোকশিল্পী দোতারার সুরে গান তোলেন। তাঁর সঙ্গে দোতারায় থাকেন চাচা আল মামুন আর বাংলা ঢোলে রতন নামের একজন। গাইবান্ধার একটি রিসোর্টের ছোট মঞ্চে প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত তাঁদের আসর বসে।

আশিকুর যেখানে গান গান, সেই মঞ্চের সামনে একটি পুকুর। পানিতে রঙিন আলো পড়ে চারপাশে তৈরি হয় এক মায়াবী পরিবেশ। তাঁর কণ্ঠে ভেসে ওঠে শাহ আবদুল করিমের গান ‘আমার বন্ধু বিনে পাগল মন...’ কিংবা বাবুল কিশোরের জনপ্রিয় গান ‘তুই বড় রঙ্গিলা বাউইরে...’। অতিথিরা মুগ্ধ হয়ে শোনেন।

আশিকুর এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু পারিবারিক সংকটের কারণে আর এগোতে পারেননি। সংসারের চাপ তাঁকে গানকেই আঁকড়ে ধরতে বাধ্য করেছে।

গান আশিকুরদের পরিবারে ঐতিহ্যের অংশ। তাঁর দাদা মকবুল হোসেন রংপুর রেডিওতে দোতারা বাজাতেন। তাঁর গলাও ছিল অসাধারণ। আশিকুর তাঁর কাছ থেকেই সংগীতে তালিম নেন। তবে তাঁর বাবা মিঠু মিয়া গান ছেড়ে দেন সংসারের টানাপোড়েন সামলাতে গিয়ে।

প্রায় আট বছর ধরে স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থা ‘এসকেএস ইন’-এ নিয়মিত গান করেন আশিকুর। মাসিক বেতন পান। পাশাপাশি গান করেন ‘রেডিও সারাবেলা’য়।

সংগীতের বাইরে আশিকুর কিছুদিন আগে নিজে একটি ছোট স্টুডিও করেছিলেন। গান রেকর্ডের পাশাপাশি রেখেছিলেন ফটোকপির মেশিন। এতে সংসার বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু এক রাতে দোকানে চুরি হয়ে সব শেষ হয়ে যায়। মামলা করার পরামর্শ পেলেও কোনো নাম বলতে না পারায় মামলা হয়নি। আবারও তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েন।

আশিকুর বিবাহিত। তাঁর এক মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে আর ছেলের বয়স তিন বছর। গান গেয়েই জীবন চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘গানই আমার একমাত্র ভরসা। গান ছাড়া আমার বাঁচার আর কোনো পথ নেই।’

অতিথি না থাকলেও রিসোর্টে নিয়ম করে বসেন আশিকুররা। কখনো দূর থেকে কেউ ডাক দিয়ে বলে ওঠেন, গান থামাবেন না। তখনই বোঝা যায়, গান তাঁদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

সম্প্রতি গাইবান্ধার শিল্পীদের নিয়ে গাইবান্ধার গায়েন নামে একটি রিয়েলিটি শো–এর আয়োজন করে জেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমি। পুরো জেলার ৫৬২ জন প্রতিযোগীর মধ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন আশিকুর। সেই আয়োজনে বিচারক ছিলেন সংগীত পরিচালক মিল্টন খন্দকার, সংগীতশিল্পী আলম আরা মিনু ও ক্লোজআপ ওয়ান তারকা মুহিন।

গাইবান্ধার এই তরুণ শিল্পীর জীবন কষ্টে ভরা, তবু গানই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাঁর কণ্ঠে যখন লোকগানের সুর ভেসে ওঠে, মনে হয়, জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার শক্তি হয়তো এখানেই লুকিয়ে আছে।

Lading . . .