মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখার লড়াই, সম্মাননা পেলেন ১৮ মৃৎশিল্পী
মাটিকে কখনো হাঁড়ি, কখনো ঘট (পাত্র) কিংবা পুতুল, আবার কখনো খেলনায় রূপ দিয়েছেন নিরঞ্জন পাল। ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার এই প্রবীণ মৃৎশিল্পী কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এবার পেয়েছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আজীবন সম্মাননা।
গতকাল শনিবার বরিশাল নগরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে ১৭তম মৃৎশিল্পী সম্মেলন ও সম্মাননা-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নিরঞ্জন পালের হাতে এ সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। মৃৎশিল্পের সংরক্ষণ, প্রসার এবং মৃৎশিল্পীদের স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে এই আয়োজন করছে শিল্প ও সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান চারুকলা বরিশাল।
এবারের সম্মেলনে মোট ১৮ জন মৃৎশিল্পীকে বিভিন্ন বিভাগে সম্মাননা দেওয়া হয়। যাঁরা মাটির শিল্প টিকিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। অনুষ্ঠানে মৃৎশিল্পীদের তৈরি শিল্পকর্মও প্রদর্শন করা হয়। মৃৎপাত্র, মনসার ঘট, পুতুল, শখের হাঁড়ি, খেলনাসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী ছিল প্রদর্শনীতে।
অনুষ্ঠানে মৃৎশিল্পীরা সম্মাননা পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তবে তাঁদের কথায় উঠে আসে মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখার আকুতিও। মৃৎশিল্পী নিরঞ্জন পাল বলেন, সম্মাননা কাজের স্বীকৃতি দেয়, উৎসাহ বাড়ায়; কিন্তু মৃৎশিল্পটি টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু সম্মাননা যথেষ্ট নয়। মাটির তৈরি পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে, শিল্পীদের কাজের বাজার তৈরি করতে হবে।
সম্মেলনের আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক সুশান্ত ঘোষ বলেন, নতুন প্রজন্মকে মাটির শিল্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।এ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সকালে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা হয়।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কনিষ্ঠ পুত্র ও শিল্পানুরাগী প্রকৌশলী ময়নুল আবেদিন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। বিশেষ অতিথি ছিলেন সামিট পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মনিরুল ইসলাম আখন্দ ও জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি চন্দ্রশেখর সাহা। এতে আরও অংশ নেন গবেষক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
প্রদর্শনীতে আসা কয়েকজন দর্শনার্থী জানান, ১৭ বছর ধরে এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মকে মৃৎশিল্পের সঙ্গে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি করছে। এখনকার অনেক শিশুর কাছেই মাটির তৈরি পুরোনো দিনের পণ্য বা খেলনা অপরিচিত। শুধু সম্মেলন বা প্রদর্শনী করে মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখা যাবে না। সাধারণ মানুষের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
মৃৎশিল্পের প্রচার ও প্রসারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিলকিস আক্তার। তিনি বলেন, একটি দেশের ঐতিহ্য শুধু জাদুঘর বা প্রদর্শনীতে সংরক্ষিত থাকলে তা জীবন্ত থাকে না। মানুষের ব্যবহার ও চর্চার মধ্য দিয়েই একটি শিল্প টিকে থাকে। তাই মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে শিল্পী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করা প্রয়োজন।
আরও যাঁরা পেলেন সম্মাননা
নারী বিভাগে মনসার ঘট তৈরির জন্য আগৈলঝাড়ার সবিতা রানী পাল ও পুরুষ বিভাগে সরাশিল্পী হিসেবে ফরিদপুরের ভাঙ্গার সমীর পাল ক্রাফটস ভিলেজেস লিমিটেডের মৃৎশিল্পী সম্মাননা পেয়েছেন।
সংগ্রামী সুধীর সেন মৃৎশিল্পী সম্মাননা (গুণরাজ বিভাগ) পেয়েছেন ভাঙ্গার কার্তিক পাল। বীর মুক্তিযোদ্ধা কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরী সম্মাননা (গুণরাজ বিভাগ) পেয়েছেন বরিশালের রূপক পাল। যোগমায়া দে মৃৎশিল্পী সম্মাননা (মৃৎপাত্র বিভাগ) পেয়েছেন বাকেরগঞ্জের লাবণ্য রানী পাল। শহীদজায়া বন্দনা গুপ্তা মৃৎশিল্পী সম্মাননা (পালপাড়া বিভাগ) পেয়েছেন ঝালকাঠির তপন কুমার পাল।
শিক্ষক নারায়ণ সাহা মৃৎশিল্পী সম্মাননা (মৃৎপাত্র বিভাগ) পেয়েছেন ঝালকাঠির নলছিটির বাদল পাল। শরৎকুমার রায় মৃৎশিল্পী সম্মাননা (মনসার ঘট বিভাগ) পেয়েছেন ঝালকাঠি সদরের অঞ্জনা পাল।
একটি দেশের ঐতিহ্য শুধু জাদুঘর বা প্রদর্শনীতে সংরক্ষিত থাকলে তা জীবন্ত থাকে না। মানুষের ব্যবহার ও চর্চার মধ্য দিয়েই একটি শিল্প টিকে থাকে। তাই মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে শিল্পী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করা প্রয়োজন।বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন, প্রশাসক, বরিশাল সিটি করপোরেশন
সুনীতিরানী দাস মৃৎশিল্পী সম্মাননা (পালপাড়া বিভাগ) পেয়েছেন পটুয়াখালীর বাউফলের শ্রীকৃষ্ণকান্ত পাল। সাথী রানী দে মৃৎশিল্পী সম্মাননা (পুতুল বিভাগ) পেয়েছেন কিশোরগঞ্জের নিকলীর খোকন পাল।ফজিলাতুন্নেছা বেগম মৃৎশিল্পী সম্মাননা (মৃৎপাত্র বিভাগ) পেয়েছেন বরিশালের শোভারানী পাল। বিমলা নাথ মৃৎশিল্পী সম্মাননা (পুতুল বিভাগ) পেয়েছেন নওগাঁর বিশ্বনাথ পাল।
আরতি মজুমদার মৃৎশিল্পী সম্মাননা (পুতুল বিভাগ) পেয়েছেন রাজশাহীর পবার সুবোধ পাল। দৈনিক শাহনামা মৃৎশিল্পী সম্মাননা (শখের হাঁড়ি বিভাগ) পেয়েছেন রাজশাহীর পবার সুশান্ত কুমার পাল। মা মৃৎশিল্পী সম্মাননা (মৃৎশিল্প প্রসার বিভাগ) পেয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শাহজাহান মৃধা। ৮৪ ব্যাচের সহযোগিতায় মৃৎশিল্পী সম্মাননা (মৃৎখেলনা বিভাগ) পেয়েছেন বাবুগঞ্জের সুজনচন্দ্র পাল। এ ছাড়া শৈল বালা ঘোষ মৃৎশিল্পী সম্মাননা পেয়েছেন পিরোজপুরের পরিমল পাল।