বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত অতিথিরা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হৃদ্‌রোগ বিভাগ ও প্রথম আলোর যৌথ আয়োজনে এই গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আজ দুপুর ১২টায় মেডিকেল কলেজেছবি: সৌরভ দাশ

যেকোনো বয়সে হতে পারে হৃদ্‌রোগ, বুকের ব্যথাকে গ্যাস্ট্রিক ভেবে সময় নষ্ট করা যাবে না

বুকে ব্যথা বা শারীরিক অস্বস্তি হলে আমরা অনেক সময় সেটিকে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা মনে করি। এরপর অ্যান্টাসিড বা গ্যাসের ওষুধ খেয়ে ঘরে বসে থাকি। কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে এভাবে সময় নষ্ট করা বিপজ্জনক। আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাই রোগীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে হাসপাতালে পৌঁছে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে হৃদ্‌যন্ত্রের রক্তনালি বন্ধ হয়ে হৃৎপেশি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি এতে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে, বাড়তে পারে হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকি।

আজ শনিবার বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এ কথাগুলো বলেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) সম্মেলনকক্ষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ বিভাগ এবং প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে এ বৈঠক আয়োজন করা হয়। সায়েন্টিফিক পার্টনার হিসেবে ছিল অপসোনিন ফার্মা। আগামী বৃহস্পতিবার বিশ্ব হার্ট দিবস।

প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে চট্টগ্রামে হৃদ্‌রোগের চিকিৎসাসেবায় অবকাঠামো ও জনবলসংকটের পাশাপাশি রোগীদের দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছানো, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং তরুণদের জীবনযাপনে পরিবর্তনকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। তাঁদের মতে, হৃদ্‌রোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত।

হার্ট অ্যাটাকের পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন চমেকের হৃদ্‌রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আশীষ দে। তাঁর মতে, অ্যাকিউট হার্ট অ্যাটাকে রক্তনালির ব্লক দ্রুত খুলতে প্রাইমারি পিসিআই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিকিৎসাপদ্ধতি। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় ভৌগোলিক দূরত্ব ও যানজটের কারণে অনেক রোগী দ্রুত পিসিআই (পোস্ট করোনারি ইন্টারভেনশন) কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন না।

গোলটেবিল বৈঠকে চিকিৎসকেরা মূলত তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেন—হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো, টেলিমেডিসিনভিত্তিক রেফারেল নেটওয়ার্ক তৈরি, কার্ডিয়াক সেবার অবকাঠামো ও জনবল বাড়ানো এবং শৈশব থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তাঁরা।

হার্ট অ্যাটাকের পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হৃদ্‌রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আশীষ দে। তাঁর মতে, অ্যাকিউট হার্ট অ্যাটাকে রক্তনালির ব্লক দ্রুত খুলতে প্রাইমারি পিসিআই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিকিৎসাপদ্ধতি। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় ভৌগোলিক দূরত্ব ও যানজটের কারণে অনেক রোগী দ্রুত পিসিআই (পোস্ট করোনারি ইন্টারভেনশন) কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন না।

দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি তুলে ধরেন চমেকের হৃদ্‌রোগ বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এ কে এম মনজুর মোরশেদ। তিনি বলেন, তুলনামূলক কম বিএমআই থাকলেও এ অঞ্চলের মানুষের পেটে অতিরিক্ত চর্বি, কম বয়সে ডায়াবেটিস, উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড ও কম ভালো কোলেস্টেরলের কারণে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি রয়েছে। নিয়মিত হাঁটাকে হৃদ্‌যন্ত্র সুস্থ রাখার সহজ ও কার্যকর উপায় হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভুল ধারণার বিষয়টি তুলে ধরেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হৃদ্‌রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ নূর উদ্দিন তারেক। বুকের মাঝখানে চাপ, জ্বালাপোড়া বা ভারী অনুভূতির পাশাপাশি হাত বা থুতনিতে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া, অতিরিক্ত ঘাম ও বমি ভাব হার্ট অ্যাটাকের পরিচিত লক্ষণ। তবে নারী, প্রবীণ ও ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে বুকে ব্যথা ছাড়াও হাতে ঝিমঝিম, মাথা হালকা লাগা, সামান্য অস্বস্তি বা হঠাৎ ঘামের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

প্রান্তিক পর্যায়ে হৃদ্‌রোগ শনাক্তকরণে লক্ষণ বিশ্লেষণের গুরুত্ব তুলে ধরেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হৃদ্‌রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কফিল উদ্দিন। তাঁর মতে, আধুনিক পরীক্ষার সুযোগ সীমিত হলেও বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় বা হঠাৎ অজ্ঞান হওয়ার মতো লক্ষণের সঠিক ইতিহাস নিলে কার্ডিয়াক ও নন-কার্ডিয়াক সমস্যার প্রাথমিক পার্থক্য করা সম্ভব।

বৈঠকে হৃদ্‌রোগের আধুনিক চিকিৎসা নিয়ে ভুল ধারণা দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন সহযোগী অধ্যাপক কাজী শামীম আল মামুন। তাঁর মতে, এনজিওগ্রাম মূলত রক্তনালির ভেতরের ব্লক শনাক্ত করার একটি পরীক্ষাপদ্ধতি। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্লক চিকিৎসায় স্টেন্ট বা অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করা হয়। হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে পেসমেকার ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে।

ডায়াবেটিসের সঙ্গে হৃদ্‌রোগের সম্পর্ক তুলে ধরে চমেকের হৃদ্‌রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক শেখ মো. হাছান মামুন জানান, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের রক্তনালিতে চর্বি জমে ব্লক হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি। হঠাৎ তীব্র ক্লান্তি, অস্বাভাবিক ঘাম বা সামান্য শ্বাসকষ্টও কখনো কখনো হার্ট অ্যাটাকের সংকেত হতে পারে। এ কারণে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হৃদ্‌রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকার প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভুল চিকিৎসা ও খাদ্যসংক্রান্ত পরামর্শ নিয়েও সতর্ক করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মো. হাবিবুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, হৃদ্‌রোগ শুধু বয়স্ক মানুষের রোগ—এমন ধারণা ভুল। তরুণদের মধ্যেও হৃদ্‌রোগ দেখা যাচ্ছে। বুকে ব্যথা হলে সেটিকে গ্যাস্ট্রিক ধরে না নিয়ে প্রথমে হৃদ্‌রোগের সম্ভাবনা যাচাই করা প্রয়োজন।

দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি তুলে ধরেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হৃদ্‌রোগ বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এ কে এম মনজুর মোরশেদ। তিনি বলেন, তুলনামূলক কম বিএমআই থাকলেও এ অঞ্চলের মানুষের পেটে অতিরিক্ত চর্বি, কম বয়সে ডায়াবেটিস, উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড ও কম ভালো কোলেস্টেরলের কারণে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি রয়েছে। নিয়মিত হাঁটাকে হৃদ্‌যন্ত্র সুস্থ রাখার সহজ ও কার্যকর উপায় হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন।

ধূমপান, অ্যালকোহল ও মাদকের কারণে হৃদ্‌যন্ত্রের বিভিন্ন ক্ষতির দিক তুলে ধরেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হৃদ্‌রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. সালেহ উদ্দিন সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ধূমপানের নিকোটিন রক্তনালির ক্ষতি ও সংকোচন ঘটায়। অ্যালকোহল দীর্ঘ মেয়াদে হৃদ্‌যন্ত্রের পাম্পিং ক্ষমতা কমাতে পারে। বিভিন্ন মাদক হৃৎস্পন্দনের ছন্দে সমস্যা তৈরি করার পাশাপাশি অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তরুণদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির দিকটি তুলে ধরেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হৃদ্‌রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. খোরশেদ আলম। তাঁর মতে, তরুণদের একটি অংশ উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও রক্তের চর্বির সমস্যায় আক্রান্ত হলেও তাঁদের বড় অংশ নিজেদের ঝুঁকি সম্পর্কে জানেন না। মুঠোফোনের পর্দায় অতিরিক্ত সময় কাটানো, ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপ, প্রক্রিয়াজাত খাবার, মাদক ও ভেপিংয়ের মতো অভ্যাস পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করছে।

উচ্চ রক্তচাপকে হৃদ্‌রোগের পাশাপাশি কিডনি জটিলতারও বড় কারণ হিসেবে তুলে ধরেন চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ বিভাগের অধ্যাপক আবু তারেক ইকবাল। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ রক্তনালির ক্ষতি করে এবং হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। এর পরিণতিতে হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট ফেইলিউরের পাশাপাশি কিডনি ফেইলিউরের ঝুঁকিও বাড়ে।

ডায়াবেটিসের সঙ্গে হৃদ্‌রোগের সম্পর্ক তুলে ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হৃদ্‌রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক শেখ মো. হাছান মামুন জানান, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের রক্তনালিতে চর্বি জমে ব্লক হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি। হঠাৎ তীব্র ক্লান্তি, অস্বাভাবিক ঘাম বা সামান্য শ্বাসকষ্টও কখনো কখনো হার্ট অ্যাটাকের সংকেত হতে পারে। এ কারণে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হৃদ্‌রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেন হৃদ্‌রোগ বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক প্রবীর কুমার দাশ। প্রচলিত খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত সাদা ভাত, চিনি ও লবণকে তিনি বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর মতে, প্রতিদিনের খাবারে লবণ ও চিনির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। হৃদ্‌রোগীদের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অবৈজ্ঞানিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ না করারও পরামর্শ দেন তিনি।

মুঠোফোনে যুক্ত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হৃদ্‌রোগ বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরী বলেন, হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ও পারিবারিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা। এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণকে তিনি হৃদ্‌রোগের প্রাকৃতিক ‘ভ্যাকসিন’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

বৈঠকের শুরুতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে হৃদ্‌রোগ–সেবার চিত্র তুলে ধরেন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এস এম ইফতেখারুল ইসলাম। তিনি জানান, গত এক বছরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ২০ হাজার ৪৪৩ জন হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের বড় একটি অংশ অ্যাকিউট করোনারি সিনড্রোম বা হার্ট ফেইলিউরের রোগী। বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রায় দুই কোটি মানুষের জন্য সরকারি-বেসরকারি ১৪টি হাসপাতালে সিসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ১৯৮টি। চাপ অনুযায়ী এটি কম বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রামে হৃদ্‌রোগের আধুনিক চিকিৎসাসেবার সম্প্রসারণের চিত্র তুলে ধরেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হৃদ্‌রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনিসুল আউয়াল। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে বর্তমানে আটটি ক্যাথল্যাব সচল রয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে প্রতি মাসে ৪০০টির বেশি প্রসিডিউর এবং ১০০ থেকে ১৪০টি স্টান্টিং করা হচ্ছে। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত থ্রম্বোলাইসিসের পাশাপাশি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে সরকারি অর্থায়নে বিনা মূল্যে প্রাইমারি পিসিআই চালুর প্রক্রিয়াও চলছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হৃদ্‌রোগ বহির্বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক সাইফ উদ্দিন সোহাগ বলেন, প্রতিদিন ২০০ থেকে ৫০০ রোগীর চাপ সামলাতে বহির্বিভাগে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র তিনজন। টিকিট কাটা থেকে বহির্বিভাগ হয়ে ইনডোরে ভর্তি পর্যন্ত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় চলে যাওয়ায় হৃদ্‌রোগীদের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসার সময় নষ্ট হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন জানান, ১৫০ শয্যার হৃদ্‌রোগ ওয়ার্ডে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ রোগী ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ থেকে ওয়ার্ডে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগায় অনেক রোগীর চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হচ্ছে। হাসপাতালের তিনটি ক্যাথল্যাবের (এনজিওগ্রাম মেশিন) একটি নষ্ট। চিকিৎসক ও নার্সের সংকটও রয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় জনবল পদায়নের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের হৃদ্‌রোগ চিকিৎসায় বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ে ইসিজি মেশিন, কাগজ ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি এবং চিকিৎসার খরচ রোগীদের সেবা গ্রহণে বাধা তৈরি করছে। কমিউনিটি ক্লিনিক ও এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে সচেতনতা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে কার্ডিয়াক সার্জারি সেবার সংকটের চিত্র তুলে ধরেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আহসান উদ্দিন মাহমুদ। তাঁর মতে, বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রায় দুই কোটি মানুষের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজই একমাত্র সরকারি কার্ডিয়াক সার্জারি কেন্দ্র। তবে পুরোনো হার্ট-লাং মেশিন, স্থায়ী পারফিউশনিস্টের অভাব, ভেন্টিলেটরের সীমাবদ্ধতা ও আইসিইউ নার্সের সংকটের কারণে সেবার সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সমাপনী বক্তব্যে হৃদ্‌রোগকে শুধু হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞদের বিষয় হিসেবে না দেখে সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আনিসুল হোসেন। প্রতিরোধ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং দ্রুত চিকিৎসা—এই তিন স্তরে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি। বুকে ব্যথাকে গ্যাস্ট্রিক ধরে নিয়ে সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

হৃদ্‌রোগের চিকিৎসায় শুধু ওষুধ তৈরি ও সরবরাহ নয়, রোগীদের নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং প্রান্তিক পর্যায়ে ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাকেও গুরুত্ব দিতে হবে বলে উল্লেখ করেন অপসোনিন ফার্মার জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক (সেলস) শামশুল আরেফিন। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি রোগ হওয়ায় হৃদ্‌রোগের ওষুধ অনেক রোগী নিয়মিত সেবন করেন না বা মাঝপথে বন্ধ করে দেন। এ কারণে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুসরণ করে একাধিক ওষুধের পরিবর্তে ‘ফিক্সড ডোজ কম্বিনেশন’ এবং দিনে একাধিকবারের পরিবর্তে দিনে একবার সেবনযোগ্য ওষুধ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।