৯৪ ধাপের ফারাক উধাও, বিশ্বকাপ খেলা পানামার বিরুদ্ধে ১-১ ড্রয়ে নতুন স্বপ্ন দেখাল ভারত
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৯৪ ধাপের ফারাক। এক দিকে সদ্য বিশ্বকাপের মঞ্চ ঘুরে আসা পানামা, অন্য দিকে সেই ভারত , যাদের নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নই বেশি উঠেছে। কিন্তু শুক্রবার বেঙ্গালুরুর শ্রী কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে সেই হিসেবগুলো যেন মাঠের বাইরে পড়ে রইল। ১৩৮ নম্বরে থাকা ভারত ৪৪ নম্বর পানামার সঙ্গে শুধু লড়াই করল না, একটা সময় পর্যন্ত ম্যাচটাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণেও রাখল। শেষ পর্যন্ত ১-১ ড্র হলেও এই ম্যাচের পর ভারতীয় ফুটবলকে ঘিরে নতুন করে স্বপ্ন দেখার কারণ তৈরি হলো। জয়ের সুযোগ এসেছিল, ইতিহাসও লেখা যেতে পারত। হয়নি। তবু খালিদ জামিলের দলের এই পারফরম্যান্স বুঝিয়ে দিল, বড় দলের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে লড়াই করার সাহস এখনও হারিয়ে যায়নি।
শুরু থেকেই পানামাকে অস্বস্তিতে রাখল ভারত
ম্যাচের শুরু থেকেই ভারতের বডিল্যাঙ্গোয়েজে আত্মবিশ্বাস ছিল স্পষ্ট। রক্ষণে শুধু পিছিয়ে থেকে অপেক্ষা নয়, বল হারালেই দ্রুত চাপ তৈরি করছিলেন ফুটবলাররা। মাঝমাঠে জায়গা কমিয়ে দেওয়া, প্রতিপক্ষের পায়ে বল গেলেই ঘিরে ধরা— এই পরিকল্পনায় প্রথমার্ধে পানামা স্বচ্ছন্দে নিজেদের খেলা সাজাতেই পারল না। বাঁ দিক দিয়ে আশিক কুরুনিয়ন ও আকাশ মিশ্রর সঙ্গে বারবার উঠে আসছিলেন রায়ান উইলিয়ামস। মনবীর সিংও পানামার রক্ষণকে ব্যস্ত রাখছিলেন। একের পর এক আক্রমণে ভারতের আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে। ২টি সহজ সুযোগ এসেছিল রায়ানের সামনে। তবে গোলের মুখে গিয়ে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তিনি।
পানামার দিক থেকেও কয়েকটি আক্রমণ এসেছিল। কিন্তু ভারতের রক্ষণ সেগুলো সামলে নেয়। আনোয়ার আলি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বল সরিয়ে দেন, আর গোলের নিচে গুরপ্রীত সিং সান্ধু ছিলেন সতর্ক। ভারত ধীরে ধীরে বুঝিয়ে দিচ্ছিল, এই ম্যাচে শুধু টিকে থাকার জন্য তারা নামেনি।
অবশেষে ৪১ মিনিটে এল সেই পরিশ্রমের পুরস্কার। নিজেদের অর্ধ থেকে আকাশ মিশ্রর বাড়ানো লম্বা বল পানামার রক্ষণের পিছনে পৌঁছে যায়। মুহূর্তের মধ্যে জায়গা করে নেন রায়ান উইলিয়ামস। সামনে শুধু গোলকিপার। ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে ভারতকে এগিয়ে দেন তিনি। কান্তিরাভার গ্যালারিতে তখন উচ্ছ্বাস— বিশ্বকাপ খেলা দলকে পিছনে ফেলেছে ভারত!
দ্বিতীয়ার্ধে চাপ বাড়ল, তবু মাথা নোয়াল না ভারত
বিরতির পর পানামা একসঙ্গে তিনটি পরিবর্তন করে। তাতেই ম্যাচের চেহারা বদলাতে শুরু করে। নতুন ফুটবলাররা আক্রমণে গতি বাড়ান। ভারতের ফুটবলারদের উপর চাপও বাড়তে থাকে। প্রথমার্ধে বিপক্ষকে যে ভাবে আটকে রাখা গিয়েছিল, তা আর একই রকম থাকল না। তবু ভারত গুটিয়ে যায়নি। সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে উঠে আসছিলেন মনবীর, রায়ানরা। পানামার চাপ সামলাতে গিয়ে অবশ্য ভারতের ফুটবলারদের ক্লান্তিও স্পষ্ট হচ্ছিল।
৬৮ মিনিটে আসে সেই সমতা ফেরানোর মুহূর্ত। বক্সের বেশ কিছুটা বাইরে থেকে ওমর ভ্যালেন্সিয়ার দুরন্ত শট আচমকাই ভারতের জালে ঢুকে যায়। বলের গতি ও বাঁকের কাছে গুরপ্রীতের কার্যত কিছুই করার ছিল না। খেলার ফল হয় ১-১। এতক্ষণ যে ম্যাচ ভারতের হাতে ছিল, সেখানে আচমকাই সব হিসেব নতুন করে শুরু। গোল খাওয়ার পর আবার বদল আনেন খালিদ জামিল। অনিরুদ্ধ থাপা, সাহাল আব্দুল সামাদ এবং এডমুন্ড লালরিন্ডিকাকে নামিয়ে মাঝমাঠ ও আক্রমণে নতুন শক্তি আনেন তিনি। শেষ দিকে ভারত আবার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু গোলের সামনে গিয়ে বারবার আটকে গেল তাদের লড়াই।
জয় আসেনি, কিন্তু বদলে গেল অনেক প্রশ্নের উত্তর
৮০ মিনিটে আশিকের ক্রস থেকে প্রায় ফাঁকা গোল পেয়েও এডমুন্ড বল বাইরে পাঠিয়ে দেন। তার কিছুক্ষণ পর এডমুন্ডের পাস থেকে মনবীরের সামনে সুযোগ এসেছিল। সেখানেও গোল হলো না। শেষ দিকে পানামাও জয়ের জন্য ঝাঁপায়। তখন ভারতের ত্রাতা গুরপ্রীত। আর একেবারে শেষ মুহূর্তে ওয়ান-টু-ওয়ান পরিস্থিতিতে বিজয়ের দুর্দান্ত ট্যাকল নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে দেয়। শেষ বাঁশির পর তাই দু'দলের স্কোর সমান— ১-১। কিন্তু ভারতের কাছে এই ৯০ মিনিটের মূল্য শুধু একটি পয়েন্টে আটকে নেই। যে দলকে র্যাঙ্কিংয়ে এতটা পিছিয়ে থেকে মাঠে নামতে হয়েছিল, সেই দলই পানামাকে একাধিক বার সমস্যায় ফেলেছে, এগিয়ে থেকেছে এবং একটা সময় পর্যন্ত জেতার স্বপ্নও দেখাচ্ছিল।
ব্রাজ়িলের বিরুদ্ধে পরের পরীক্ষাটা নিঃসন্দেহে অনেক বেশি কঠিন হবে। কিন্তু তার আগে পানামা ম্যাচ ভারতকে অন্তত একটা বিশ্বাস ফিরিয়ে দিল— প্রতিপক্ষের নাম যত বড়ই হোক, মাঠে নিজেদের লড়াইটা ঠিক ভাবে করতে পারলে ভারতও ম্যাচকে কঠিন করে তুলতে পারে। কান্তিরাভার রাতটা হয়তো জয়ে শেষ হয়নি, কিন্তু ভারতীয় ফুটবলের জন্য এই ১-১ অনেক দিন পর একটা আশার আলো হয়ে রইল।