উরুগুয়ের কাছে ১-৬ হারল ভারত।,ছবি: অর্ণব চক্রবর্তী

থাপার গোল স্বপ্ন দেখিয়েছিল, শেষমেশ উরুগুয়ের কাছে আত্মসমর্পণ ভারতের

৪৪ বছর আগে উরুগুয়ের কাছে ১-৩ হেরেও মাথা উঁচু করে মাঠ ছেড়েছিল প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভারত। ১৯৮২ সালের ইডেন উদ্যানে নেহরু গোল্ড কাপের সেই হার তাই ভারতীয় ফুটবলের লজ্জার স্মৃতি নয়, বরং লড়াইয়ের স্মৃতি। মানস ভট্টাচার্যের গোল, তারকা-সমৃদ্ধ উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ভারতের প্রতিরোধ— সব মিলিয়ে সেই ম্যাচ আজও গর্বের সঙ্গে মনে রাখে ভারতীয় ফুটবল । মঙ্গলবার যুবভারতীতে সেই ছবিটাই যেন উল্টো হয়ে গেল। খালিদ জামিলের ভারত ১-৬ হারল। হারতেই পারে ভারত, কিন্তু যে ভাবে লড়াই ছাড়ল, যে ভাবে একের পর এক গোল হজম করল, সেটাই সবচেয়ে বেশি কষ্টের। প্রথমার্ধে ১-২ পিছিয়েও যে দলটা স্বপ্ন দেখাচ্ছিল, দ্বিতীয়ার্ধে সেই দলটাই যেন নিজেদের হারিয়ে ফেলল।

প্রথমার্ধে স্বপ্ন দেখিয়েছিল ভারত

শুরুটা অবশ্য ভারতের জন্য ধাক্কার ছিল। ১০ মিনিটে পরমবীরের ফাউল থেকে পেনাল্টি পায় উরুগুয়ে। স্পট কিক থেকে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন ডারউইন নুনেজ় (Darwin Nunez)। কিন্তু পিছিয়ে পড়েও ভেঙে যায়নি ভারত। বরং ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরতে শুরু করে খালিদ জামিলের দল। ২৩ মিনিটে রায়ান উইলিয়ামসের (Ryan Williams) শট কোনও মতে বাঁচান উরুগুয়ের গোলরক্ষক কার্দোজ়ো। ফিরতি বলের অপেক্ষায় ছিলেন অনিরুদ্ধ থাপা (Anirudh Thapa)। সুযোগ নষ্ট করেননি তিনি। বল জালে জড়িয়ে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ভারতকে সমতায় ফেরান থাপা। ১৯৮২-র পর উরুগুয়ের বিরুদ্ধে গোল করা দ্বিতীয় ভারতীয় ফুটবলার হলেন তিনি। সেই মুহূর্তে যুবভারতীতে যেন নতুন করে বিশ্বাস জন্মেছিল— এই ভারত পারে। ম্যাচে ফেরার রাস্তা খুঁজে পেয়েছে তারা।

উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচে গোল করার পর অনিরুদ্ধ থাপার উচ্ছ্বাস।

থাপার গোলে সমতায় ফেরার পর ভারত যখন আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছিল, তখনই প্রবল বৃষ্টিতে থমকে যায় ম্যাচ। ২৭ মিনিটের মাথায় খেলা বন্ধ করে দুই দলকেই ড্রেসিংরুমে পাঠানো হয়। প্রায় ৩৫ মিনিট পর ফের শুরু হয় খেলা। কিন্তু সেই ব্রেকের পর খেলা শুরু হতেই মাত্র এক মিনিটের মধ্যে নান্দেজ়ের পাস থেকে গোল করেন ম্যাক্সিমিলিয়ানো আরৌহো। ফের ১-২ পিছিয়ে যায় ভারত। থাপার গোলে যে গতি ও আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, ম্যাচ বন্ধ থাকার পর তা ধাক্কা খায়। তবু ভারত তখনও লড়াইয়ে ছিল। বিরতিতে ১-২ পিছিয়ে থাকলেও ভারতের সামনে তখনও একটা সুযোগ ছিল— একটা গোল হলেই, আর ম্যাচের ছবিটা ফের বদলে যেতে পারত।

বিরতির পর যেন অন্য ভারত

কিন্তু সেই ভারত আর দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে ফিরল না। ৫৩ মিনিটে তোরেইরার বাড়ানো বলে নুনেজ় হেড করে বল নামিয়ে দেন জ়ালাজ়ারের (Zalazar) জন্য। জোরালো শটে ৩-১ করেন তিনি। এর পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার ধাক্কা। ভিনাসের বাড়ানো বলে ম্যাক্সিমিলিয়ানো আরৌহো ভারতের বক্সে ঢুকে বাঁ পায়ের শটে ৪-১ করেন। এ বার যেন ভারতের পায়ের নীচ থেকে মাটিটাই সরে গেল। যে রক্ষণ প্রথমার্ধে কোনও মতে লড়াইটা ধরে রেখেছিল, তারাই দ্বিতীয়ার্ধে একের পর এক ভুল করতে শুরু করল। উরুগুয়ের আক্রমণ আটকানোর বদলে ভারতীয় ফুটবলাররা বার বার জায়গা ছেড়ে দিলেন। খালিদ জামিল একের পর এক পরিবর্তন করলেন, কিন্তু ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আর ফেরানো গেল না। আপুইয়া অবশ্য দূরপাল্লার শটে ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর জোরালো শট অল্পের জন্য ক্রসবারের উপর দিয়ে চলে যায়। সেই শটটুকুতেই যেন তখনও ভারতীয় দলের হাল ছেড়ে না দেওয়ার শেষ চেষ্টা দেখা গিয়েছিল।

উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচে গোল করার পর অনিরুদ্ধ থাপার উচ্ছ্বাস।

শেষ আধ ঘণ্টায় ভেঙে পড়ল ভারত

কিন্তু শেষ আধ ঘণ্টায় আর কোনও প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি ভারত। ৭১ মিনিটে আবার ভারতীয় রক্ষণ ভেঙে পড়ে। পেলিস্ত্রি বক্সের ভিতরে সানাব্রিয়াকে বল দেন। পরিবর্ত হিসেবে নামা সানাব্রিয়া কাছ থেকে গোল করে ব্যবধান ৫-১ করেন। এর পরও থামেনি উরুগুয়ে। ৭৮ মিনিটে গুরপ্রীত, আপুইয়া ও মনবীরকে তুলে আলবিনো, রিকি ও রহিম আলিকে নামানো হয়। কিন্তু ততক্ষণে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে গিয়েছে উরুগুয়ের হাতে। ৮৬ মিনিটে পেলিস্ত্রির পাস থেকে আগুইরে বাঁকানো শটে দুরন্ত গোল করেন। ১-৬ পিছিয়ে পড়ে ভারত। শেষ বাঁশি বাজার পর যুবভারতীর মাঠে পড়ে রইল ছয় গোলের ভারী ধাক্কা।

৪৪ বছর আগে ইডেনে ১-৩ হেরেছিল ভারত। কিন্তু সেই হারে ছিল লড়াই, ছিল সাহস, ছিল শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। মঙ্গলবারের ১-৬ হার তাই শুধু স্কোরলাইন নয়। সবচেয়ে যন্ত্রণার জায়গা হল— একটা সময় পর্যন্ত যে ভারত স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই ভারতই দ্বিতীয়ার্ধে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। উরুগুয়ের মতো দলের কাছে হার অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু ঘরের মাঠে, নিজের দর্শকদের সামনে, এ ভাবে লড়াই ছেড়ে দেওয়া— এই হারটাই তাই ভারতীয় ফুটবলের জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্টের।