‘দু’ ম্যাচে ১০ গোল হজম ভালো বিষয় নয়’, ভারতীয় দলের আসল সমস্যা কোথায়, ব্যাখ্যা খালিদের
ভারত (India) ফুটবলে নতুন অধ্যায়ের কথা বলা হচ্ছিল। ব্রাজ়িল ও উরুগুয়ের মতো বিশ্বের প্রথম সারির দুই দলের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগকে ভবিষ্যতের প্রস্তুতি হিসেবেই দেখছিলেন অনেকেই। কিন্তু মাঠের ফলাফল ভারতের জন্য খুব একটা সুখের হলো না। ব্রাজ়িলের কাছে ০-৪ হারের পর উরুগুয়ের বিরুদ্ধেও ১-৬ ব্যবধানে হারতে হয় খালিদ জামিলের (Khalid Jamil) দলকে। দুই ম্যাচে মোট ১০ গোল হজম করেছে ভারত। আরও উদ্বেগের বিষয়, শেষ তিন আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভারতের ঝুলিতে মাত্র ২ গোল, বিপরীতে হজম করা গোলের সংখ্যা ১১।
এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে দলের প্রস্তুতি, রক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক স্তরের প্রতিযোগিতায় ভারতের বর্তমান অবস্থান নিয়ে। তবে ম্যাচের পর খালিদ কোনও অজুহাত খোঁজেননি। বরং নিজের দলের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার পাশাপাশি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ভালো দলের বিরুদ্ধে সামান্য ভুলও বড় মূল্য চোকাতে বাধ্য করে। আর কোচ হিসেবে সেই ব্যর্থতার দায় তাঁরও।
ছোট ভুল, বড় শাস্তি
উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচের শুরুটা ভারতের পক্ষে ছিল। উরুগুয়ের কাছে পেনাল্টিতে গোল খাওয়ার পরেও অনিরুদ্ধ থাপার গোলে সমতা ফেরায় ভারত। যুবভারতীতে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যেও তখন আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু সেই ফল বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি খালিদ জামিলের ছেলেরা। ম্যাচ যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে দুই দলের মানের পার্থক্য। উরুগুয়ে আক্রমণে গতি বাড়িয়েছে, আর ভারত বারবার ভুল করেছে নিজেদের অর্ধে।
খালিদের মতে, সমস্যার মূল জায়গা এখানেই। ম্যাচের পর সাংবাদিক সম্মেলনে এসে তিনি বলেন, ‘ভালো দলের বিরুদ্ধে একটি ভুলেরও বড় মূল্য দিতে হয়। প্রতিপক্ষ সেই ভুলের সুযোগ নেয়। তাই সব সময় সতর্ক থাকতে হবে।’ এই মন্তব্যের মধ্যেই যেন ভারতের সাম্প্রতিক দুই ম্যাচের সারাংশ লুকিয়ে রয়েছে। ব্রাজ়িল ম্যাচেও প্রথম দিকে ভারত কিছুটা লড়াই করেছিল। উরুগুয়ের বিরুদ্ধেও গোল করে এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মনোযোগ ধরে রাখতে পারেনি দল। আন্তর্জাতিক স্তরে যেখানে একটি ভুলই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে, সেখানে ভারত বারবার সেই ভুল করেছে। খালিদের দাবি করেছেন, শুধু ম্যাচ চলাকালীন নয়, প্রস্তুতির সময় থেকেও ফুটবলারদের মনোযোগী থাকতে হবে। কারণ এই স্তরে প্রতিপক্ষকে দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া মানেই বিপদ ডেকে আনা।
সংখ্যাগুলোই বলে দিচ্ছে সমস্যার গভীরতা
ফুটবলে সব সময় পরিসংখ্যান পুরো গল্প বলে না। কিন্তু অনেক সময় সংখ্যাই বাস্তব পরিস্থিতিকে সবচেয়ে স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরে। ভারতের ক্ষেত্রেও এখন সেই ছবিটাই সামনে আসছে। পানামার বিরুদ্ধে ১-১ ড্র। তার পর ব্রাজ়িলের কাছে ০-৪ হার। এর পর মঙ্গলবার উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ১-৬ পরাজয়। এই পরিসংখ্যান শুধু ডিফেন্সের সমস্যাই তুলে ধরছে না। একই সঙ্গে আক্রমণভাগের সীমাবদ্ধতাও সামনে আনছে। কারণ বড় দলের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় থাকতে গেলে শুধু গোল বাঁচালেই হয় না, সুযোগ তৈরি করা এবং গোল করার ক্ষমতাও থাকতে হয়।
খালিদও মেনে নিয়েছেন, পরপর দুই ম্যাচে ১০ গোল হজম কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেও দেন, ‘আমরা অনেক বেশি গোল হজম করেছি। এমনটা হওয়া উচিত ছিল না। দু’ ম্যাচে ১০ গোল খাওয়া ভালো বিষয় নয়।’ ভারতের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সম্ভবত এখানেই। গোল হজমের সংখ্যা শুধু বেশি নয়, ম্যাচের বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের ভুলও দেখা যাচ্ছে। কখনও রক্ষণে অবস্থানগত সমস্যা, কখনও প্রতিপক্ষের দৌড় সামলাতে না পারা, আবার কখনও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মনোযোগ হারিয়ে ফেলা— সব মিলিয়ে দলের উন্নতির জন্য এখনও অনেক কাজ বাকি।
দায় এড়ানোর পথ নিলেন না খালিদ
বড় ব্যবধানে হারলে সাধারণত কোচেরা নানা ব্যাখ্যা দেন। কেউ প্রস্তুতির ঘাটতির কথা বলেন, কেউ ফুটবলারদের ভুলের দিকে আঙুল তোলেন। কিন্তু খালিদ জামিল সেই পথে হাঁটেননি। বরং তিনি বারবার বলেছেন, এই হার কোনও এক বা দু’জন ফুটবলারের ব্যর্থতা নয়। এটি পুরো দলের ব্যর্থতা। আর সেই দলের প্রধান হিসেবে দায় তাঁরও। খালিদ বলেন, ‘এটা দলগত হার। কোচ হিসেবে দায়িত্ব আমাকে নিতেই হবে। এখন কাউকে দোষারোপ করার সময় নয়।’
খালিদের এই মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ব্রাজ়িল ও উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচের পর স্বাভাবিক ভাবেই ফুটবলারদের ব্যক্তিগত ভুল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় কোচ সেই বিতর্কে যেতে চাননি। তাঁর মতে, কোনও একজনকে দায়ী করলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং কোথায় ভুল হচ্ছে, কেন একই ধরনের সমস্যা বারবার দেখা যাচ্ছে, সেটাই বিশ্লেষণ করা বেশি জরুরি। তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে নিজের পরিকল্পনা নিয়েও তাঁর আত্মসমালোচনা রয়েছে। ম্যাচের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ভারত যে ভাবে ভেঙে পড়েছে, তাতে কোচিং স্টাফকেও নিজেদের কাজ খতিয়ে দেখতে হবে।
শেখার সুযোগ, কিন্তু উন্নতির চাপও বাড়ছে
ব্রাজ়িল এবং উরুগুয়ের মতো দলের বিরুদ্ধে খেলা নিঃসন্দেহে ভারতীয় ফুটবলের জন্য বড় অভিজ্ঞতা। এই ধরনের ম্যাচে খেলেই বোঝা যায় আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে কতটা পথ পেরোতে হবে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে না পারলে তার মূল্যও কমে যায়। ভারতের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই হার থেকে শিক্ষা নেওয়া। শুধু স্কোরলাইন নয়, ম্যাচের ভিতরে কোথায় পিছিয়ে পড়ছে দল, কেন মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না, কেন প্রতিপক্ষের চাপ সামলাতে সমস্যা হচ্ছে— সে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
সামনে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ রয়েছে। সেই ম্যাচের আগে খালিদ জামিল ও তাঁর কোচিং স্টাফের কাছে সবচেয়ে বড় কাজ হবে ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং রক্ষণকে আরও সংগঠিত করা। কারণ শেষ তিন ম্যাচে ১১ গোল হজমের পর এটা স্পষ্ট, আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গেলে শুধু লড়াই করার মানসিকতা নয়, আরও বেশি শৃঙ্খলা, মনোযোগ এবং ধারাবাহিকতার প্রয়োজন।
উরুগুয়ের কাছে ছয় গোল হজমের রাতের পর খালিদের কথাতেই যেন ভারতের বর্তমান বাস্তবতার সবচেয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা মিলেছে— ভালো দলের বিরুদ্ধে ভুল করার সুযোগ নেই। আর সেই জায়গাতেই এখনও সবচেয়ে বেশি উন্নতির প্রয়োজন ভারতীয় ফুটবলের।