ভরল না যুবভারতী।,ছবি: রাতুল মণ্ডল

ভারতের বিরুদ্ধে ব্রাজ়িলের পাশে বাংলাদেশিরা, নীলে সাজল কলকাতা, তবু হাউসফুল হলো না যুবভারতী

কলকাতার ফুটবলপ্রেমে ব্রাজ়িলের জায়গাটা বরাবরই আলাদা। কিন্তু এ দিন ছবিটা ছিল একটু অন্য রকম। এক দিকে ভিনিসিয়াস জুনিয়রদের দেখার উন্মাদনা, অন্যদিকে নিজের দেশের জার্সি গায়ে ভারতকে সমর্থনের আবেগ— যুবভারতীর গ্যালারিতে দুইয়ের টানাপোড়েনই ছিল চোখে পড়ার মতো। ম্যাচ শুরুর অনেক আগে থেকেই স্টেডিয়ামের চারপাশে ভিড় জমিয়েছিলেন সমর্থকেরা। কারও গায়ে ভারতের নীল, কারও গায়ে ব্রাজ়িলের হলুদ-সবুজ জার্সি। গালে তেরঙ্গা, হাতে জাতীয় পতাকা, আবার কোথাও দেখা গেল ব্রাজ়িলের পতাকা।

কলকাতার বহু মানুষের হৃদয়ে ব্রাজ়িলের জন্য আলাদা জায়গা থাকলেও, শনিবার প্রতিপক্ষ যখন ভারত, তখন দেশের দলের সমর্থনই যে শেষ কথা— গ্যালারির ছবি বার বার সেটাই বুঝিয়ে দিল। ব্রাজ়িলের তারকাদের এক ঝলক দেখার উন্মাদনার সঙ্গে পাল্লা দিল ভারতের জন্য গলা ফাটানোর আওয়াজ। তবে বহু প্রতীক্ষিত এই ম্যাচ ঘিরে সেই চেনা কলকাতা ডার্বির মতো তীব্র, উত্তপ্ত আবহ অবশ্য তৈরি হয়নি।

দুই দলের জার্সি, দুই দেশের পতাকায় সাজল যুবভারতী

ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই যুবভারতীর আশেপাশে জমতে শুরু করেছিল ফুটবলপ্রেমীদের ভিড়। রাস্তার দু’ধারে ভারতের পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছিল ব্রাজ়িলের জার্সিও। কেউ প্রিয় দলের জার্সি গায়ে স্টেডিয়ামের দিকে এগিয়েছেন, কেউ আবার গালে এঁকেছেন নিজের পছন্দের দলের পতাকার রং। কোথাও ভারতের তেরঙ্গা, কোথাও ব্রাজ়িলের হলুদ-সবুজ— ম্যাচের আগেই যুবভারতীর চারপাশ যেন দুই দেশের রঙে সেজে উঠেছিল।

ভারত-ব্রাজ়িল ম্যাচের আগে সমর্থকদের উন্মাদনার ছবির কোলাজের সঙ্গে যুবভারতীর ফাঁকা গ্যালারির ছবি।

শুধু কলকাতা বা বাংলার ফুটবলপ্রেমীরাই নন, ব্রাজ়িলকে দেখতে দেশের অন্য প্রান্ত থেকেও এসেছিলেন সমর্থকেরা। মুম্বই থেকে তিন ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন এক বাবা। তাঁরা ব্রাজিলিয়ান, বর্তমানে কাজের সূত্রে এই দেশে থাকেন। সাম্বার ছন্দে তাঁদের উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো। দিল্লি থেকেও এসেছিলেন ব্রাজ়িলের এক সমর্থক। পড়শি বাংলাদেশ থেকেও একাধিক সমর্থক পাড়ি দিয়েছিলেন কলকাতায়। প্রিয় ব্রাজ়িলকে সামনে থেকে দেখতে কেউ ৯ হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেছেন, কেউ আবার খরচ করেছেন ১৫ হাজার টাকা।

বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা থেকে কলকাতায় এসেছিলেন আন্নাফিউ মালিক। তাঁর আসার কারণ নিয়ে কোনও দ্বিধাই নেই। বললেন, ‘আমি ব্রাজ়িলের টানেই এই দেশে এসেছি। ২০০৬ সাল থেকে বিশ্বকাপ দেখছি। তখন থেকেই আমি ব্রাজ়িলের সমর্থক। ব্রাজ়িল আমাদের দেশের এত কাছে খেলতে এসেছে, এই সুযোগ কী ভাবে ছাড়ি?’ কিন্তু প্রতিপক্ষ যখন পড়শি দেশ ভারত, তখনও কেন ব্রাজ়িল? প্রশ্ন শুনে এক বাংলাদেশি সমর্থকের মুখে হাসি। তাঁর সাফ উত্তর, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই ব্রাজ়িলের সমর্থক। তাই ব্রাজ়িল খেললে ব্রাজ়িলের হয়েই গলা ফাটাব।’

তবে যুবভারতীর গ্যালারির বড় ছবিটা ছিল খানিকটা আলাদা। ব্রাজ়িলের তারকাদের দেখার উন্মাদনা ছিল, ভিনিসিয়াস জুনিয়রদের সামনে থেকে দেখার উত্তেজনাও ছিল তুঙ্গে। কিন্তু মাঠে যখন নিজের দেশের দল, তখন আবেগের জায়গাটা যে অন্য রকম— গ্যালারিতে বার বার সেটাই স্পষ্ট হয়েছে। ব্রাজ়িলের জার্সি গায়ে সমর্থক ছিলেন ঠিকই, কিন্তু ভারতের জন্য গলা ফাটানো মানুষের সংখ্যাই ছিল বেশি। ম্যাচ শুরুর আগে দুই দেশের সমর্থকদের আবেগ মিলেমিশে তৈরি হয়েছিল অন্য রকম এক পরিবেশ। তবে সেই আবেগের চরিত্রে ছিল স্পষ্ট পার্থক্য— ব্রাজ়িলকে ঘিরে ছিল তারকাদের দেখার উন্মাদনা, আর ভারতের জন্য ছিল নিজের দেশের প্রতি টান।

ভারত-ব্রাজ়িল ম্যাচের আগে সমর্থকদের উন্মাদনার ছবির কোলাজের সঙ্গে যুবভারতীর ফাঁকা গ্যালারির ছবি।

ডার্বির মতো উন্মাদনা কোথায়?

তবে কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের মাপকাঠি যদি হয় মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ডার্বি, তা হলে এ দিনের আবেগকে সেই জায়গায় রাখা কঠিন। ডার্বির দিন ম্যাচ শুরুর বহু আগে থেকেই শহরের রাস্তাঘাট, চায়ের দোকান, পাড়া— সব জায়গায় ফুটবল নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। যুবভারতীর গ্যালারি ভরে যায়, দুই দলের সমর্থকদের আওয়াজে কাঁপে গোটা এলাকা। ভারত-ব্রাজ়িল ম্যাচে সেই মাত্রার উন্মাদনা দেখা গেল না। ব্রাজ়িলের মতো দলের তারকারা কলকাতায় এলেও যুবভারতীর সব আসন পূর্ণ হয়নি। অর্থাৎ, আবেগ ছিল, আগ্রহ ছিল, দুই দলের জার্সি-পতাকায় রঙিন হয়েছিল স্টেডিয়াম চত্বরও। কিন্তু কলকাতার ডার্বির সেই উন্মাদ, বেপরোয়া ফুটবল আবেগ এ দিন তৈরি হয়নি।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য একটা ছবি স্পষ্ট হয়ে গেল। ব্রাজ়িলের প্রতি কলকাতার পুরনো ভালোবাসা নিজের জায়গায় থাকলেও, ভারত বনাম ব্রাজ়িল ম্যাচে দেশের দলই ছিল সমর্থনের প্রথম পছন্দ। গ্যালারিতে ব্রাজ়িলের হলুদ চোখে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু ভারতের জন্য ওঠা আওয়াজই বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে— বিদেশি দল যতই প্রিয় হোক, নিজের দেশের জায়গাটা আলাদা।