ব্রাজ়িলের কাছে ০-৪ হারল ভারত।,ছবি: অর্ণব চক্রবর্তী

স্বপ্ন দেখিয়েও শেষরক্ষা হলো না, ব্রাজ়িলের সঙ্গে ১৩২-এর ব্যবধানটা ভারতের রয়েই গেল

একটা সময় মনে হচ্ছিল, যুবভারতীতে হয়তো অন্য গল্প লিখবে ভারত। ব্রাজ়িলের (Brazil) মতো দলের বিরুদ্ধে প্রথম ২৮ মিনিট চোখে চোখ রেখে লড়াই, গ্যালারি জুড়ে ভারতের জন্য গলা ফাটানো— সব মিলিয়ে আশার আলো দেখাচ্ছিল খালিদ জামিলের (Khalid Jamil) দল । কিন্তু এস্তেভাওয়ের (Estevao) প্রথম গোলের পরই যেন বদলে গেল ম্যাচের ছবি। শেষ পর্যন্ত ভিনিসিয়াসদের কাছে ০-৪ গোলে হারল ভারত (India)। ২০০৪ সালে এই যুবভারতীতেই জ়িকোর জাপানের কাছে ০-৪ গোলে হেরেছিল ভারত। সে বার অবশ্য ম্যাচটি ছিল বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বের। ২২ বছর পর একই মাঠে সেই একই ফল ফিরে এল। তবে শনিবারের রাতটা শুধু চার গোলের হারের গল্প নয়, প্রথম ২৮ মিনিটে ব্রাজ়িলকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েও ধীরে ধীরে ম্যাচ থেকে হারিয়ে যাওয়ার গল্পও।

প্রথম ২৮ মিনিটে ব্রাজ়িলের বিরুদ্ধে বেশ সাহসী ফুটবল খেলছিল ভারত। আক্রমণ সামলানোর পাশাপাশি সুযোগ পেলেই দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে উঠছিল খালিদের দল। ৮ মিনিটে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের শট আটকে দেন গুরপ্রীত সিং সান্ধু (Gurpreet Singh Sandhu)। ১৩ মিনিটে মনবীর সিংয়ের (Manvir Singh) সামনেও সুযোগ এসেছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি।

তার পর ২৮ মিনিটে এস্তেভাওয়ের গোল। বক্সের ডান দিকে বল পেয়ে ফার্স্ট পোস্ট লক্ষ্য করে বাঁ পায়ে শট নেন তিনি। গুরপ্রীত ঝাঁপিয়েও বল আটকাতে পারেননি। ১-০ এগিয়ে যায় ব্রাজ়িল। সেই গোলের পরেই যেন ভারতের বডিল্যাঙ্গোয়েজ বদলে যায়। আক্রমণে ওঠার বদলে আরও বেশি করে রক্ষণে ঢুকে পড়তে শুরু করল তারা। প্রথম ২৮ মিনিটে যে ভারত ব্রাজ়িলকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল, গোল খাওয়ার পর সেই ভারতকেই অনেক বেশি রক্ষণাত্মক দেখাল।

ভারত-ব্রাজ়িল ম্যাচের ছবির কোলাজ।

প্রথমার্ধেই দুই গোল, বদলে গেল ভারতের খেলা

৩৬ মিনিটে ফের গোলের সুযোগ তৈরি করে ব্রাজ়িল। ডান দিক থেকে আসা ক্রসে মাথা ছোঁয়ান পেদ্রো (Pedro)। গুরপ্রীত ঝাঁপিয়েছিলেন, কিন্তু বল পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ভারত তখনও কোনও ভাবে টিকে ছিল। কিন্তু ৪২ মিনিটে আর রক্ষা হয়নি। এস্তেভাওয়ের বাড়ানো বল পেয়ে বক্সের মাঝখান থেকে শট নেন পেদ্রো। গুরপ্রীতের হাতে লেগে বলের গতি কিছুটা বদলালেও শেষ পর্যন্ত সেটা জালেই ঢুকে যায়। ব্রাজ়িল ২-০ এগিয়ে যেতে আর চাপ বাড়ে ভারতের।

বিরতিতে দুই গোল পিছিয়ে থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গুরপ্রীতের জায়গায় প্রভসুখন সিং গিলকে (Prabhsukhan Singh Gill) নামান খালিদ। কিন্তু গোলকিপার বদলালেও ভারতের দুর্দশা কাটল না। বরং রক্ষণেই আরও বেশি মন দিতে হল ভারতকে। ৫৮ মিনিটে সেই চাপ থেকেই তৃতীয় গোল। বিজয় ভার্গেস (Vijay Varghese) বলের দখল হারালে সুযোগ পেয়ে যান স্যামুয়েল লিনো (Samuel Lino)। বক্সের ডান দিক থেকে বাঁকানো শটে সেকেন্ড পোস্টে বল রাখেন তিনি। প্রভসুখন ঝাঁপিয়েও আটকাতে পারেননি।

এর মধ্যেই দু’দলই একের পর এক পরিবর্তন শুরু করে। এ দিন গোটা ম্যাচে ভারত ১১ জন এবং ব্রাজ়িল ১০ জন ফুটবলারকে বদলায় । ফলে ম্যাচের শেষ দিকে দুই দলের খেলাতেই স্বাভাবিক ভাবেই ছন্দের বদল দেখা যায়। তবে ভারত তখনও গোলের খোঁজে।

ভারত-ব্রাজ়িল ম্যাচের ছবির কোলাজ।

রায়ানের দৌড়ে একটু আশা, শেষ হাসি লিনোর

তিন গোল পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে কয়েক বার ব্রাজ়িলের বক্সে পৌঁছয় ভারত। সেই আক্রমণগুলির বেশির ভাগের সঙ্গেই জড়িয়ে ছিলেন রায়ান উইলিয়ামস (Ryan Williams)। বাঁ দিক থেকে বার বার উঠে এসে ব্রাজ়িলের রক্ষণে চাপ তৈরি করেন তিনি। ৬৩ মিনিটে তাঁর শট গোলকিপার পেদ্রো মরিস্কোর উপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু গোলের সামনে থেকে মাউরো (Mauro) মাথা ঠান্ডা রেখে বল ক্লিয়ার করে দেন। এর পর মনবীরের সঙ্গে রায়ানের বোঝাপড়ায় আরও একটি সুযোগ তৈরি হয়। মনবীর বাঁ দিক থেকে বল বাড়ান রায়ানের জন্য। বক্সের কাছে পৌঁছে মাটিতে পড়ার আগেই শট নেন রায়ান। কিন্তু বল লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। দ্বিতীয়ার্ধে রায়ানের দৌড়ে ভারতের আক্রমণে কিছুটা প্রাণ ফিরলেও গোলের মুখ আর খুলতে পারেনি তারা।

ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে বরং আরও একটি গোল খাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ইনজুরি টাইমে জয় গুপ্তার (Jay Gupta) ক্লিয়ারেন্স ভুল হলে বল পেয়ে যান ভান্দেরসন (Vanderson)। জোরালো শট নিলেও প্রভসুখন দুর্দান্ত দক্ষতায় তা আটকে দেন। মনে হচ্ছিল, ০-৩ ফলেই হয়তো শেষ হবে ম্যাচ। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার কয়েক সেকেন্ড আগে ফের ভারতের জালে বল জড়িয়ে দেন লিনো। তাঁর জোড়া গোলে ৪-০ ম্যাচ পকেটে পোড়ে ব্রাজ়িল।

প্রথম ২৮ মিনিটে যে যুবভারতী ভারতকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল, শেষ বাঁশির পর সেই গ্যালারিতেই নেমে এল হতাশা। দুই দলের মধ্যে ১৩২ র‌্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধানটা মাঠে শুরুতেই যেন মুছে দিয়েছিল ভারত। কিন্তু ২৮ মিনিটের পর ম্যাচের ছবিটা বদলে গেল। শেষ পর্যন্ত ০-৪ ব্যবধানে হারলেও, এই রাতটা শুধু স্কোরলাইনের নয়— ব্রাজ়িলের মতো দলের বিরুদ্ধে শুরুতে লড়াই করার সাহস এবং পরে সেই লড়াইটা ধরে রাখতে না পারার আক্ষেপও থেকে গেল।