মিথ্যাবাদীর মনের ভেতরটা কেমন, জানেন?
কিছু মানুষ কথার জালে অন্যকে আটকে ফেলতে সিদ্ধহস্ত। অন্যদিকে যাঁকে মিথ্যা বলা হচ্ছে, তিনি হয়তো বিশ্বাস আর সন্দেহের দোলাচলে পড়ে যান। বিশ্বাস করতে চান; অথচ মনের ভেতর খচখচ করে। কিছু একটা যেন ঠিক নেই!
তাহলে মিথ্যা বলার সময় মানুষের মনে কী ঘটে? সত্য গোপন করতে কতটা মানসিক পরিশ্রম করতে হয়? আর কীভাবেই–বা বোঝা সম্ভব, কেউ মিথ্যা বলছেন কি না?
জার্মানির মারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক তাবেয়া ভেখটারশয়জার ও ক্রিস্টিনা জুখোৎস্কির ২০২৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী, সত্য বলার তুলনায় মিথ্যা বলতে সাধারণত বেশি মানসিক পরিশ্রম করতে হয়।
কারণ, মিথ্যা বলার সময় সত্য কথাটি চেপে রাখতে হয়। তার বদলে এমন একটি উত্তর তৈরি করতে হয়, যা বিশ্বাসযোগ্য শোনাবে। আগের বক্তব্যের সঙ্গে মিল রাখা এবং কথায় অসংগতি এড়ানোর প্রয়োজনও হতে পারে।
মিথ্যা বলার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গবেষকেরা ‘অ্যাকটিভেশন–ডিসিশন–কনস্ট্রাকশন–অ্যাকশন’ নামের একটি তাত্ত্বিক মডেলের কথা উল্লেখ করেছেন। এই মডেল অনুযায়ী, মিথ্যা বলার চারটি ধাপ আছে।
১. সত্য মনে করা: আসলে কী ঘটেছিল, তা মনে করা।
২. সিদ্ধান্ত নেওয়া: সত্য বলবেন, নাকি মিথ্যা বলবেন, তা ঠিক করা।
৩. মিথ্যা সাজানো: সত্যের বদলে কী বলবেন, সেই বক্তব্য তৈরি করা।
৪. মিথ্যা বলা: তৈরি করা বক্তব্য অন্যের সামনে উপস্থাপন করা।
এসব ধাপে চিন্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে ভয়, অপরাধবোধ কিংবা উদ্বেগ যুক্ত হলে মিথ্যা বলা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া মিথ্যাবাদীকে নিজের বলা কথাও মনে রাখতে হয়। পরে একই বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আগের বক্তব্যের সঙ্গে মিল রাখতে হয়। এভাবে একটি মিথ্যা ঢাকতে গিয়ে কখনো কখনো আরও অনেক মিথ্যার জন্ম হয়।
গবেষকেরা দুটি পরীক্ষা চালিয়েছেন। প্রথমটিতে অংশ নেন ৪৯ জন, দ্বিতীয়টিতে ৪৮ জন, অর্থাৎ মোট ৯৭ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
পরীক্ষার শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের কাল্পনিক অপরাধের পরিস্থিতিতে রাখা হয়। প্রথম পরীক্ষায় তাঁদের একটি ইউএসবি স্টিক বদলে ফেলতে বলা হয়েছিল। দ্বিতীয় পরীক্ষায় একটি খাম থেকে এক হাজার ইউরো নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়।
এরপর কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হয়। কখনো সত্য বলতে, কখনো মিথ্যা বলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রশ্নগুলোর মধ্যে কাল্পনিক অপরাধের পাশাপাশি সাধারণ দৈনন্দিন বিষয়ও ছিল।
গবেষকেরা লক্ষ করেন, সত্য ও মিথ্যা বলার সময় উত্তর দিতে কতক্ষণ লাগছে। পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চান, উত্তর দেওয়ার সময় তাঁরা কতটা মানসিক চাপ ও আবেগগত অস্বস্তি অনুভব করেছেন।
ফলাফলে দেখা যায়, সত্য বলার তুলনায় মিথ্যা উত্তর দিতে বেশি সময় লেগেছে। মিথ্যা বলার সময় অংশগ্রহণকারীরা বেশি মানসিক পরিশ্রম ও আবেগগত চাপ অনুভব করেছেন।
বিশেষ করে সত্য উত্তরটি চেপে রাখা এবং সত্য ও মিথ্যা উত্তরের মধ্যে পরিবর্তন করার কাজকে তাঁরা বেশি কঠিন বলে জানিয়েছেন। মিথ্যা বলার সময় ভয়, অপরাধবোধ, উদ্বেগ ও অস্বস্তির অনুভূতিও তুলনামূলক বেশি ছিল।
আরেকটি বিষয়ও উঠে এসেছে। কাল্পনিক অপরাধসংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে অংশগ্রহণকারীদের সাধারণ প্রশ্নের তুলনায় বেশি সময় লেগেছে। এসব প্রশ্নে তাঁরা বেশি মানসিক ও আবেগগত চাপ অনুভব করেছেন।
তবে গবেষণাটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে করা হয়েছে। বাস্তব জীবনে সব মানুষের ক্ষেত্রে একই প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ধরুন, কোনো বন্ধু কথা দিয়ে কথা রাখেননি। পরে এমন একটি ব্যাখ্যা দিলেন, যা আপনার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।
কথা বলার সময় তাঁর অস্বাভাবিক দ্বিধা, উত্তর দিতে দেরি কিংবা উদ্বেগ আপনার নজরে আসতে পারে। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, মিথ্যা বলার সময় এমন প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা আছে।
তবে শুধু এসব আচরণ দেখে কাউকে মিথ্যাবাদী বলা ঠিক হবে না।
কেউ সত্য বলার সময়ও ভয় বা উদ্বেগ অনুভব করতে পারেন। আবার কেউ মিথ্যা বলার সময় নিজের আবেগ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
‘সাইকোলজি টুডে’তে প্রকাশিত আলোচনায় বলা হয়েছে, পরিচিত মানুষের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন বোঝা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। কারণ, তিনি সাধারণত কীভাবে কথা বলেন, কেমন আচরণ করেন, সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা থাকে।
তবু আচরণের পরিবর্তনকে মিথ্যার প্রমাণ ধরে নেওয়া যাবে না; বরং তাঁর বক্তব্যে অসংগতি আছে কি না, আগের কথার সঙ্গে মিল রয়েছে কি না—সেসব বিবেচনা করা যেতে পারে।
কথা বলতে গিয়ে থেমে যাওয়া, চোখে চোখ না রাখা কিংবা অস্থির দেখানো মানেই কেউ মিথ্যা বলছেন—এমন নয়। লজ্জা, ভয়, উদ্বেগ কিংবা কঠিন কোনো সত্য বলতে গিয়েও মানুষ এমন আচরণ করতে পারেন।
আবার অভ্যাসগতভাবে মিথ্যা বলেন, এমন কেউ নিজের বক্তব্য ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক দক্ষও হতে পারেন।
গবেষণাটি মিথ্যা বলার সময় মানুষের চিন্তা ও আবেগের ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি হয়, তা বুঝতে সাহায্য করেছে। কিন্তু কারও আচরণ দেখে নির্ভুলভাবে মিথ্যা শনাক্ত করার কোনো পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করেনি।
তাই শুধু মুখভঙ্গি, অস্থিরতা কিংবা উত্তর দিতে দেরি হওয়ার ওপর নির্ভর না করে বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করাই ভালো।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে ও কগনিশন অ্যান্ড ইমোশন