শেয়ারবাজারগ্রাফিকস: প্রথম আলো

শেয়ারবাজারে ঋণ করে বিনিয়োগ করলে লাভ কতটা, ঝুঁকি কেমন

শেয়ারবাজারের অপর নাম পুঁজিবাজার। পুঁজি মানে হচ্ছে আপনার নিজের মূলধন। আপনার কাছে যদি দৈনন্দিন বা মাসের খরচ চালানোর পর বাড়তি অর্থ জমা থাকে সেটিই আপনার পুঁজি বা বিনিয়োগযোগ্য উদ্বৃত্ত অর্থ। যে অর্থ থেকে আপনি ঝুঁকি নিয়ে বাড়তি মুনাফার আশায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলেও আপনার ব্যক্তি জীবনের প্রয়োজনে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না।

আপনি নিশ্চয় নিতান্ত বাধ্য না হলে ঋণ করে সংসার চালান না বা ঋণ করে ব্যাংকে টাকা জমান না। যদি সেটি না করেন তাহলে শেয়ারবাজারে কেন ঋণ করে বিনিয়োগ করবেন?

ঋণ করলে সেই ঋণের বিপরীতে আপনাকে সুদ গুনতে হবে। সেই সুদের টাকা আসবে কোথা থেকে। আপনি তো শেয়ারবাজারে এসেছেন বাড়তি কিছু আয় বা মুনাফার আশায়। এখন সেই মুনাফা যদি ঋণের সুদ পরিশোধে খরচ হয়ে যায়, তাহলে ওই বিনিয়োগ আপনার জন্য কতটা লাভজনক? প্রশ্নটি নিজেকে করুন, সেই হিসাব মেলান।

শেয়ারবাজারে ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করলে বাড়তি লাভের সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি পুঁজি হারানোর আশঙ্কাও আছে। যদি এমন হয়, ঋণ করে বিনিয়োগ করার পর লাভ তো দূরে থাক, পুরো বিনিয়োগই ঝুঁকিতে পড়ল, তাহলে ঋণের সুদ দেবেন কোথা থেকে, কীভাবে?

তাই ঋণ পরিহার করে যতটা সম্ভব নিজের সঞ্চয়ের একটি অংশ বিনিয়োগ করুন। আর এমন শেয়ারে বিনিয়োগ করুন যেখানে দ্রুত হয়তো আপনি লাভের মুখ দেখবেন না। কিন্তু পুঁজি হারানোর ভয় তুলনামূলক কম।

আমাদের শেয়ারবাজারে এমন অনেক কোম্পানি আছে, যেগুলোর গত ৫–১০ বছরের শেয়ারের দাম বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বাজারে এসব শেয়ারের দাম নির্ধারিত একটি সীমার মধ্যে ওঠানামা করে। অর্থাৎ ভালো মানের এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে আপনার পুঁজির পুরোটা কখনো হারিয়ে যাবে না। তবে ভালো শেয়ার কম দামে কিনেও খুব বেশি লাভের মুখ দেখবেন না যদিও আপনি ঋণ করে বিনিয়োগ করেন। কারণ, আপনার লাভের একটি অংশ ঋণের সুদ পরিশোধেই চলে যাবে। ওই যে একটি প্রবাদ আছে না, ‘লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়।’ শেয়ারবাজারে ঋণ করে বিনিয়োগ করলে আপনার ক্ষেত্রেও প্রবাদটি সত্যি হয়ে উঠতে পারে।

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ঋণ কারা দেয়? ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আপনাকে কখনো সরাসরি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ঋণ দেবে না। সে ক্ষেত্রে আপনি ব্যক্তিগত ঋণ নিয়ে হয়তো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন। অথবা পরিবার–পরিজনের কাছ থেকে ধার করে বিনিয়োগ করতে পারেন। এর বাইরে শেয়ারবাজারে শেয়ারের বিপরীতে ঋণ দেয় ব্রোকারেজ হাউজ বা মার্চেন্ট ব্যাংক। যাদের মাধ্যমে আপনি বিও হিসাব খুলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন। আপনি কি জানেন, এসব প্রতিষ্ঠান কোথা থেকে টাকা নিয়ে আপনাকে ঋণ দিচ্ছে? না জানলে বলছি, এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রচলিত সুদে টাকা এনে তার সঙ্গে বাড়তি সুদের হার যোগ করে আপনাকে ঋণ দেয়। অর্থাৎ শেয়ারবাজারে ঋণের সুদ প্রচলিত সুদের হারের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি, এটি ১৫–২০ শতাংশের কম নয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ১৫–২০ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করে আপনি যদি মুনাফা করতে চান তাহলে আপনাকে কত হারে মুনাফা করতে হবে? আপনার কাঙ্ক্ষিত মুনাফা করতে হলে নিশ্চয় সেটি ২৫–৩০ শতাংশের কাছাকাছি বা বেশি হতে হবে। কিন্তু এটি কতটা বাস্তবসম্মত?

ধরা যাক, আপনি এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেন ঋণ করে। আর আরেকজন নিজের পুঁজি থেকে এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেন। আপনারা দুজনই একই শেয়ার কিনলেন, একই দামে। ধরা যাক, সেই দাম ১০০ টাকা। এখন ওই শেয়ারের দাম বেড়ে যদি ১১০ টাকা হয়, তাহলে যিনি ঋণ ছাড়া বিনিয়োগ করেছেন তার মুনাফা হলো ১০ টাকা। আপনারও তা–ই। কিন্তু আপনি এই মুনাফায় ঋণের সুদই পরিশোধ করতে পারবেন না। অন্যদিকে যিনি ঋণ ছাড়া বিনিয়োগ করেছেন, তিনি শেয়ারের দাম ১০ টাকা বাড়লে বিক্রি করে দিয়ে ১০ টাকায় মুনাফা হিসেবে তুলে নিতে পারবেন।

তাহলে কে বেশি লাভবান হলেন? আপনি নাকি যিনি ঋণ ছাড়া নিজের পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন তিনি? হিসাবটি নিজেই মিলিয়ে দেখুন। এ জন্যই বলা শেয়ারবাজারে খুব দক্ষ বা অভিজ্ঞ না হলে ঋণ করে বিনিয়োগে যাবেন না।

জানেন তো, বড় পুঁজি সব সময় ছোট পুঁজিকে খেয়ে ফেলে। তাই ঋণ করার আগে পুঁজির ভিত্তি মজবুত করুন। তারপর ঋণ করে বিনিয়োগের কথা ভাববেন।