‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা’র দৃশ্য। নেটফ্লিক্স

পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চায় পাকিস্তান, থামাতে পারবেন ভারতীয় গোয়েন্দা

ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে বহু ভারতীয় সিনেমা-সিরিজে। তবে সত্তরের দশকের পটভূমিতে নির্মিত ‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা’র সময়কালের জন্যই আলাদা। এমন একটা সময়, যখন ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা ‘র’ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স বা আইএসআই প্রায় দুই যুগের পুরোনো। আইএসআইয়ের সঙ্গে টক্করে কি পারবে র? এমন গল্প নিয়ে নির্মিত নেটফ্লিক্সের ছয় পর্বের সিরিজটিতে অনেক ইতিবাচক দিক থাকলেও শেষ পর্যন্ত জমল কি?

একনজরে
সিরিজ: ‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা’
ধরন: স্পাই থ্রিলার, ড্রামা
অভিনয়ে: প্রতীক গান্ধী, সানি হিন্দুজা, তিলোত্তমা সোম, রজত কাপুর
ক্রিয়েটর: গৌরব শুক্লা
পরিচালনা: সুমিত পুরোহিত
স্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্স
পর্বসংখ্যা:
দৈর্ঘ্য: ৪ ঘণ্টা

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় সিনেমা-সিরিজ গুপ্তচরের দুনিয়ায় যেন বড্ড বেশি ঢুকে পড়েছে। একই দিনে ‘ওয়ার ২’ আর ‘তেহরান’ মুক্তি পায়, কাছাকাছি সময়ে আসা ‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা’ও একই ঘরানার। একটা সময় যেমন একসময় ভগৎ সিংয়ের কাহিনি বলতে প্রতিযোগিতায় নেমেছিল বলিউড; তেমনি এখন গুপ্তচরের গল্পকে সামনে আনা হচ্ছে দেশপ্রেমের নতুন রূপ হিসেবে। কাছাকাছি সময়ে মুক্তি পাওয়া জিওহটস্টারের সিরিজ ‘সালাকার’-এর সঙ্গে ‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা’র অনেক মিল আছে। প্রথমটি ঠিক পাতে দেওয়ার মতো নয়, সে তুলনায় নেটফ্লিক্সের সিরিজটি বেশ পরিণত।

বিষ্ণু (প্রতীক গান্ধী) একজন ভারতীয় গুপ্তচর, যার কাজ ইসলামাবাদে পাকিস্তানের গোপন পরমাণু পরিকল্পনা বানচাল করা। তাকে ঠেকাতে কোমর বেঁধে নেমেছে আইএসআই প্রধান মুর্তজা মালিক (সানি হিন্দুজা)।

একদিকে স্ত্রীর (তিলোত্তমা সোম) সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম, অন্যদিকে পাকিস্তানজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গুপ্তচর নেটওয়ার্ক সামলানো—এই দ্বন্দ্বেই আবর্তিত বিষ্ণুর জীবন। অন্যদিকে মালিককেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তিনি যেমন বিশ্বাসঘাতক খুঁজে বের করতে মরিয়া, তেমনি পাকিস্তানকে আঞ্চলিক সুপারপাওয়ার বানাতে পরমাণু প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি আর ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য নিয়ে এগোয় গল্প।

সিরিজটির সবচেয়ে বড় চমক সানি হিন্দুজার অভিনয়। মুর্তজা মালিক চরিত্রে তিনি খলনায়ককে নতুন আলোয় তুলে ধরেছেন। তিনি যতটা নির্মম, ততটাই দ্বন্দ্বময়—দেশের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে নিজের ভেতরের মানবিকতাকে ঘৃণা করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, কাহিনির আসল নায়ক তিনিই। অন্যদিকে প্রতীক গান্ধীর বিষ্ণু চরিত্রটি শুরুতে অনেক সম্ভাবনা দেখালেও শেষ দিকে দেশপ্রেমী ‘হিরো’ হয়ে ওঠার মোড় ঘোরানোটা বেশ কৃত্রিম লেগেছে।

সিরিজটি বানাতে গিয়ে নির্মাতার দ্বিধা স্পষ্ট। একদিকে তিনি গুপ্তচরদের দ্বৈত জীবন, যন্ত্রণা, পরিচয় হারানোর বেদনা দেখাতে চেয়েছেন কিন্তু সেটা তিনি শেষ পর্যন্ত টেনে নিতে পারেননি। সিরিজটিতে আছে ইন্দিরা গান্ধী, জুলফিকার আলী ভুট্টো, হেনরি কিসিঞ্জার, মুয়াম্মার গাদ্দাফির মতো আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কিন্তু বিদেশি চরিত্রদের সংলাপ শুনলে মনে হয়, ভারতীয় অভিনেতা জোর করে ইউরোপ-আমেরিকান টান দিচ্ছেন। তিলোত্তমা সোম চেষ্টা করেছেন কিন্তু তাঁর চরিত্রটি এত দুর্বলভাবে লেখা, কিছু করার ছিল কমই। র প্রধান চরিত্রে রজত কাপুরও মন্দ নন।

তবে গৎবাঁধা অন্য ভারতীয় সিরিজের চেয়ে ‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা’ অনেক দিক থেকেই উজ্জ্বল। বেশির ভাগ ভারতীয় সিনেমা ও সিরিজেই দেখা যায়, পাকিস্তান দুর্বল; কেবল মার খেয়েই যাচ্ছে। কিন্তু এখানে আইএসআইকে শক্তিশালী দেখানো হয়েছে। তারা যে র-এর চেয়ে অনেক অভিজ্ঞ, সেটাও তুলে ধরেছেন নির্মাতা। প্রথম দিকে তো

আইএসআইয়ের কাছে বারবার র হেরে যাচ্ছে। নায়ক বিষ্ণুর চেয়ে ‘খলনায়ক’ মুর্তজা অগ্রসর। ইসলামাবাদে আসার পর এক সন্ধ্যায় বিষ্ণুর বাড়িতে হাজির হয় মুর্তজা। বিষ্ণু তখন ঘরে ছিল না। বিষ্ণুর স্ত্রীর উদ্দেশে তার বলা সংলাপ ‘আমরা দুজন একই কাজ করি, তবে আলাদা আলাদা জায়গায়’ মনে দাগ কাটে।
পাকিস্তানি নারী সাংবাদিক ফাতিমা খানের (কৃতিকা কামরা) চরিত্রটিও দারুণ। ফাতিমা সরকারের সমালোচনা করে নিজ দেশে শত্রুর চোখে পরিণত হন। তবে তাঁর চরিত্রটির ব্যাপ্তি আরও একটু বাড়ালে জমত।

সিরিজজুড়ে নির্মাতা গুপ্তচরদের ধূসর দুনিয়া দেখানোর চেষ্টা করেছেন; বলতে চেয়েছেন, এটা এমন এক যুদ্ধ, যেখানে কেউই পুরোপুরি জেতে না। কিন্তু ক্লিশে দেশাত্মবোধের আঁচ দিয়ে শেষ করেছেন সিরিজটি; হয়তো জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্যই।