Advertisement

সাবমেরিন কেব্‌ল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মেহেন্দীগঞ্জে ৬৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন প্রায় ৪ লাখ মানুষ

প্রথম আলো

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট, ২০২৫

বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা-ইজিবাইক বন্ধ। তাই মানুষের যাতায়াতের বাহন পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ঝুঁকিপূর্ণ টমটম। আজ শুক্রবার সকালে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার সদর পাতারহাট বন্দরেছবি: প্রথম আলো
বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা-ইজিবাইক বন্ধ। তাই মানুষের যাতায়াতের বাহন পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ঝুঁকিপূর্ণ টমটম। আজ শুক্রবার সকালে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার সদর পাতারহাট বন্দরেছবি: প্রথম আলো

বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায় সাবমেরিন কেব্‌ল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় টানা ৬৫ ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ আছে। এতে উপজেলার প্রায় ৪ লাখ মানুষের স্বাভাবিক জীবনে চরম অচলাবস্থা নেমে এসেছে। থমকে গেছে ব্যবসা, বাণিজ্য, চিকিৎসা ও যোগাযোগব্যবস্থা।

স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। প্রথমে তাঁরা ভেবেছিলেন, এটি নিয়মিত লোডশেডিং। কিন্তু রাত গভীর হয়ে ভোর হলেও বিদ্যুৎ ফেরেনি। আজ শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।

বরিশাল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২–এর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০০৪ সালে মেহেন্দীগঞ্জের নলবুনিয়া এলাকার গজারিয়া নদীর তলদেশে বসানো সাবমেরিন কেব্‌লের মাধ্যমে বরিশাল থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। কিন্তু নদীর তলদেশে থাকা সেই কেব্‌ল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের জনজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে।

বিদ্যুৎ না থাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবারে রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গেছে, খেয়ে না–খেয়ে দিন কাটছে। অনেকের রেফ্রিজারেটরে রাখা খাবার নষ্ট হয়ে গেছে। ব্যাটারিচালিত যানবাহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমজীবীদের রোজগারে টান পড়েছে। হাসপাতাল ও ফার্মেসিগুলোয় তৈরি হয়েছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। বিশেষ করে ইনসুলিন, রেবিকবিসি, টিটি ভ্যাকসিন ও অন্যান্য ওষুধ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

৫০ শয্যার মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যান ঘুরছে না, শৌচাগারে পানি নেই। অনেক রোগী চিকিৎসাসেবা না নিয়েই বাড়ি ফিরছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়েছে। বাজারে দোকানপাট অন্ধকারে থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় স্থবির। সরকারি দপ্তরগুলোয়ও সেবাগ্রহীতারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সকালে অফিসে গিয়ে বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করেও সেবা না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে তাঁদের।

মেহেন্দীগঞ্জ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহাদাত সোহাগ বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় ফার্মেসিগুলো নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ফ্রিজে রাখা ইনসুলিন ও অন্যান্য ইনজেকশন, যেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে হাজারো রোগী ঝুঁকিতে পড়েছেন।’

উপজেলা নির্বাচন অফিসের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে পড়েছে। নাসির উদ্দিন খান নামের এক সেবাগ্রহীতা বলেন, তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ছেলের ভোটার আইডি কার্ড করার জন্য অফিসে এসেছিলেন, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় কাজ না করেই ফিরে যেতে হয়েছে। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সাইদুর রহমান জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় কোনো সেবাই দেওয়া যাচ্ছে না। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ফটোকপি মেশিন সব বন্ধ হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে মেহেন্দীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১–এর উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. মফিজুল ইসলাম আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, ‘গজারিয়া নদীতে জাহাজ নোঙর করার সময় গ্যাপারের আঘাতে নদীর তলদেশে থাকা সাবমেরিন কেব্‌ল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে তিনটি ফেজে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ঘটনার পর থেকেই প্রকৌশলী ও ডুবুরিরা কাজ করছেন। সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে এবং মেরামতের কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে, অল্প সময়ের মধ্যেই বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।’

তবে সমিতির আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, আপাতত একটি ফেজ মেরামত করে সাময়িক বিদ্যুৎ চালুর চেষ্টা চলছে। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে তিনটি ফেজের নতুন কেব্‌ল প্রতিস্থাপন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় লাগতে পারে। পুরোনো কেব্‌ল মেরামত করলেও অন্তত আরও দুই দিন লাগবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপমহাব্যবস্থাপক মফিজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি আজ অন্তত একটি ফেজ চালু করতে। ফলে উপজেলা সদরের বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল হবে। পুরোনো কেব্‌ল মেরামত করে সব ফেজ সচল করতে সময় লাগবে। নতুন কেব্‌ল প্রতিস্থাপন করতে হলে আরও বেশি সময় লাগবে। তারপরও আমরা দ্রুত ভোগান্তি লাঘবের চেষ্টা করছি।’

মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াজুর রহমান বলেন, ‘মেহেন্দীগঞ্জে বিদ্যুৎ বরিশাল থেকে মুলাদী হয়ে ৩৩ কেভি লাইনের মাধ্যমে গজারিয়া নদীর তলদেশে মেরিন কেব্‌লের সাহায্যে আসে। সেই কেব্‌ল ছিঁড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসক বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসচিবকে অবহিত করেছেন। ইতিমধ্যে অপটিক্যাল ফাইবার কেব্‌ল আনার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, এক দিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।’

Lading . . .