প্রকাশ: ৩০ আগস্ট, ২০২৫

ভোলায় মেঘনার বুকে নৌকায় ভাসা জীবন তাদের-এরা বেদে ও মানতা সম্প্রদায়। নৌকায় জন্ম, তাতেই পাতেন সংসার, সেখানেই ত্যাগ করেন শেষ নিঃশ্বাস। নদীর পানিই তাদের ভরসা। কোথাও ঠাঁই নেওয়ার মতো এক টুকরো মাটি নেই তাদের। বিশুদ্ধ পানি নেই, স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নেই, স্বাস্থ্যসেবা নেই, নেই শিক্ষার আলোও।
বছরের পর বছর ধরে সীমাহীন বঞ্চনার শিকার তারা। তবুও নদীর ঢেউকে বুকে নিয়েই তারা টিকে আছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তাদের এই ভাসমান জীবনের কষ্টের সঙ্গী শুধুই নদী। জেলা সদরের রাজাপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে মেঘনা নদীর জোড়খালে থাকেন এই দুই সম্প্রদায়ের অন্তত দেড়শ পরিবার। তাদের একমাত্র পেশা নদীতে জাল ও বড়শি দিয়ে মাছ ধরা। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় এরা জেলে হিসাবে নিবন্ধনের আওতায় আসেননি। তাই সরকারি সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, প্রতি পরিবারের নৌকায় রয়েছে ছোট ছোট একাধিক শিশু। যাদের বয়স ৫ বছরের নিচে। শিশুদের নিরাপদে রাখতে তাদের কোমরে দড়ি বাঁধা। একটি নৌকায় রান্না করছিলেন রোজিনা বেগম নামে এক নারী। তার সন্তানরা খাবারের অপেক্ষায় পাশে বসে আছে। আরেকটি নৌকায় দেখা যায়, শিশুর কোমরে বাঁধা দড়ির আরেক প্রান্ত মায়ের কোমরে। জাল ফেলে মাছ ধরছেন সেই মা। নৌকার বাসিন্দারা জানান, নদীর পানি ফিটকিরি দিয়ে খেতে হয় তাদের। যে পানিতে গোছল ও থালাবাসন পরিষ্কার করেন। আবার সেই পানিতেই টয়লেটের কাজ সারেন।
জোড়খালে থাকার জন্য চাঁদা দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন বেদেরা। বেদে ও মানতা সম্প্রদায়ের সরদার আব্দুর রহিম জানান, তারা নৌকায় বসবাসের জন্য ধর্মীয় কোনো অনুষ্ঠান পালন করতে পারছেন না। সম্প্রতি গড়ে ওঠা স্কুলের পাশে ছোট্ট একটি ঘর করা হয়েছে। যেখানে নামাজ আদায় করার ব্যবস্থা হয়েছে। ওই মসজিদের ইমাম আশরাফ উদ্দিন নিয়মিত নামাজ পড়ান। এলাকার কয়েকজন ইমামকে বেতন দেন।
এদিকে ঝড়তুফান থেকে নিরাপদ থাকতে জোড়খালের পাশাপাশি পাশের আরও কয়েকটি খালে নৌকা রাখতে গেলেই এলাকার প্রভাবশালী একটি গ্রুপ নৌকাপ্রতি বছরে এক হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা চাঁদা নেন।
আদাই সরদার, মো. মিরাজ সরদার, মো. হাবিব সরদার, ফরিদ সরদার জানান, গেল ৫০ বছর ধরে তারা এই এলাকায় নৌকা নিয়ে অবস্থান করছেন। বলা যায়, ভোলার জোড়খাল এখন তাদের স্থায়ী ঠিকানা। এখানে সরকারিভাবে বেদে পল্লী করা হলে তাদের স্থায়ী ঠিকানা হতো।
স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী আমির হোসেন জানান, নৌকার থাকা শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য তার উদ্যোগে নদীপাড়েই একটি টিনের ঘর করে তাতে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পড়াচ্ছেন তার স্ত্রী। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০টি শিশু আসে। আরবি শিক্ষা দেন মসজিদের ইমাম। তবে এই শিশুদের খেলাধুলার কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রতিদিন শিশুরা নদীতে লাফিয়ে পড়ে গোসল করে-এটাই তাদের খেলা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান জানান, বর্তমানে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণের কাজ বন্ধ রয়েছে। তাই এই মালতা বা বেদেদের পুনর্বাসনের জন্য বিকল্প প্রস্তাবের চিন্তা রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৫০টি ঘর করা গেলে ৫০ পরিবার বাস করতে পারবেন। এক্ষেত্রে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করা যেতে পারে। সরকারের খাস জমিতে বেদে পল্লী করার জন্য জমিও খুঁজতে হবে। তিনি জানান, এদের জন্য স্কুলের পাশেই টিউবওয়েল স্থাপনের ব্যবস্থা করবেন। আর চাঁদা আদায়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আরও পড়ুন