প্রকাশ: ৩০ আগস্ট, ২০২৫

পড়ন্ত বিকেলের আলো ক্রমেই গাছগাছালির ছায়ায় হারিয়ে যাচ্ছে। পিরোজপুরের কাউখালীর সুবিদপুর গ্রামের একটি টিনের ছাউনি দেওয়া কাঁচা ঘরের বারান্দায় বসে বেতির গাঁথুনি তুলছেন অনিল চন্দ্র পাটিকর। বয়সের ভারে শরীর ন্যুব্জ, চোখে ঝাপসা দেখেন, তবু হাতে থামেনি বুনন। কারণ, এ শুধু জীবিকা নয়, তাঁদের বংশের শত শত বছরের ঐতিহ্য—শীতলপাটি।
গ্রামজুড়ে পাটিকরদের ব্যস্ততা। নারী-পুরুষ সবাই হাতে বেতি নিয়ে পাটি বুনছেন। যন্ত্রে নয়; বরং মমতা, কুশলতা আর ক্লান্তিহীন শ্রমে বোনা এই শীতলপাটি বহন করে দক্ষিণ বাংলার শিল্প-ঐতিহ্য। একসময় এ গ্রামের শীতলপাটির খ্যাতি ছিল সারা দেশে। এখনো প্রায় ৬০টি পরিবার এই পেশায় টিকে আছে। কিন্তু দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে এর কদর, বেড়েছে দারিদ্র্য।
দক্ষিণাঞ্চলের মৃৎশিল্পী ও পাটিকরদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন বরিশাল চারুকলার সংগঠক সুশান্ত ঘোষ। তিনি বলেন, এ অঞ্চলে বসতি স্থাপনের পর যেসব অঞ্চলে বেশি পাইত্রা জন্মাত, সেসব অঞ্চল ঘিরেই পাটিকর পরিবারগুলো এক স্থানে বসতি গড়ে এই পেশায় নিয়োজিত। এ অঞ্চলে পাটিকরদের এই পেশা তিন শতাব্দীর বেশি সময়ের পুরোনো।
অনিল পাটিকরের বাবা সীতানাথ, দাদা দ্বীনবন্ধু পাটিকর ছিলেন দক্ষ কারিগর। অনিল ছোটবেলা থেকেই পাটির কাজ শিখেছেন। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে পাটির চাহিদা ছিল, সম্মানও ছিল। এখন দিন আনি দিন খাই অবস্থা। খরচ এত বেশি যে হাতে কিছুই থাকে না। আগে নিজেদের পাইত্রাবাগান ছিল, এখন জমি নেই। এক পোন (৮০টি) পাইত্রা কিনতে হয় প্রায় ৪০০ টাকায়, যা দিয়ে কেবল একটি পাটি তৈরি হয়।’
পাশেই কাজ করছেন অনিলের ছেলে অসীম ও পুত্রবধূ সঞ্চিতা রানী। অসীম বলেন, ‘মাসে ১০টা পাটি বানাতে পারি না। দামি শীতলপাটির এখন তেমন বাজার নেই। মাঝেমধ্যে ঢাকা, বরিশাল বা বড় কোনো শহর থেকে অর্ডার এলে বানাই, কিন্তু তাতে সংসার চলে না।’ সঞ্চিতা যোগ করেন, ‘আমাদের চাল-ডাল, তেল-নুন সব কিনতে হয়। এই আয় দিয়ে আর জীবন চলে না। তবু ছাড়তে পারি না, এটা আমাদের পূর্বপুরুষের পেশা।’
ষাটোর্ধ্ব বাসুন্তি পাটিকর এখনো বুনছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর এই কাজই তাঁর ভরসা। তিনি জানান, পাইত্রার মানভেদে পাটির দাম ভিন্ন হয়। প্রথম শ্রেণির বেতি দিয়ে বানানো শীতলপাটি ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, মাঝারি মানের পাটি ২ হাজার থেকে ৩ হাজার আর সাধারণ পাটি ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
২০১৭ সালে ইউনেসকো শীতলপাটিকে মানবতার অমূল্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু কারিগরদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরিশালে পাটিকরদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করে ‘রান’ নামের একটি বেসরকারি সংস্থা। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক রফিকুল আলম বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ৭০০ পরিবার এখনো এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। সরকারি সহায়তা ও রপ্তানির উদ্যোগ না থাকলে এ ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।
গোধূলি নেমে আসছে, আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। হঠাৎ নেমে এল ঝুম বৃষ্টি। বাইরে অন্ধকার, ভেতরে ক্ষীণ আলো। সেই আলোয় বসে সঞ্চিতা রানী পাটিকর নিঃশব্দে বুনে চলেছেন পাটি। প্রতিটি বুননে যেন জড়িয়ে আছে এক প্রত্যয়—বেঁচে থাকার, টিকে থাকার, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিকড় আঁকড়ে রাখার এক সাহসী আখ্যান।