Advertisement

টেবিলে ছড়ানো মেয়ের পাঠ্যবই বুকে নিয়ে মায়ের বিলাপ

প্রথম আলো

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট, ২০২৫

নদীতে ডুবে মেয়ের মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না রোজিনা আকতার । আজ বেলা দুইটার দিকে কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার মৌলভীরচর এলাকায়প্রথম আলো
নদীতে ডুবে মেয়ের মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না রোজিনা আকতার । আজ বেলা দুইটার দিকে কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার মৌলভীরচর এলাকায়প্রথম আলো

শিখা আকতারের পড়ার টেবিলে ছড়িয়ে আছে পাঠ্যবই, খাতা, কলম। ছড়ানো বইপত্র থেকে একটি বুকে তুলে নিয়ে তার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বিলাপ করতে থাকেন শিখার মা রোজিনা আকতার। বিলাপ করতে করতে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলছিলেন, ‘অ মা বই এগুন আঁই পড়িবার লাই রাখি গিয়স দে নে। তুই কা আঁরে ফেলাই গিয়সগই।’ (মারে বইগুলো কি আমার পড়ার জন্য রেখে গিয়েছিস। আমাকে কেন ফেলে গিয়েছিস এভাবে।)

নদীতে ডুবে একমাত্র মেয়ের মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না রোজিনা আকতার। শোকে কাতর মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। জ্ঞান ফিরলেই মেয়েকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

আজ শনিবার বেলা দুইটার দিকে কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার মৌলভীরচর এলাকায় গৃহবধূ রোজিনা আকতারের বাড়িতে গেলে এ দৃশ্য চোখে পড়ে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে বাড়ির পাশের মাতামুহুরী নদীতে ডুবে রোজিনা আকতারের মেয়ে শিখা আকতার (পিংকি মনি) মারা যায়। সে চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। এ সময় তার দুই খালাতো বোন আসমাউল হোসনা ও তাসপিয়া জান্নাতকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। আসমাউল একই প্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণির ও তাসপিয়া ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

জানা যায়, গতকাল শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শিখা আকতার, আসমাউল হোসনা ও তাসপিয়া জান্নাত মাতামুহুরী নদীতে গোসলে যায়। এ সময় আসমাউল নদীর হাঁটুপানিতে ছিল। আর শিখা আকতার ও তাসপিয়া গলাসমান পানিতে ছিল।

আসমাউল হোসনা গতকালের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে প্রথম আলোকে বলে, ‘হঠাৎ স্রোতে শিখা ও তাসপিয়া ডুবে যেতে থাকে। এ সময় হাত নেড়ে শিখা বাঁচার আকুতি জানালে আমি নদীতে নেমে তাকে কাঁধে তুলে নিই। কাঁধে তুলে নিতেই তার ভর সইতে না পেরে দুজনেই ডুবে যেতে থাকি। একপর্যায়ে পাশে গোসলরত এক নারী একটি লাঠি দিলে সেটি ধরে আমি কূলে আসি। ওই সময় নদীর অপর প্রান্ত থেকে নুরুল আজিম নামের এক বাসিন্দা সাঁতরে এসে তাসপিয়াকে উদ্ধার করে। ততক্ষণে শিখা কয়েকবার হাত দেখিয়ে ডুবে যায়।’

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া পৌরসভার মাতামুহুরী সেতুর পাশ ঘেঁষে বাঁ দিকে একটু গেলে টিনের ঘেরা ও ছাউনি দিয়ে নদীতে ডুবে মারা যাওয়া শিখা আকতারের বাড়ি। শিখার বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া বাড়িতে মা–বাবার সঙ্গে থাকে জীবিত উদ্ধার হওয়া আসমাউল হোসনা ও তাসপিয়া জান্নাত।

বাড়িতে ঢুকতেই কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল শিখার মা রোজিনা আকতারের। শিখার নানা স্মৃতি মনে করে কান্না করছিলেন তিনি। সাংবাদিক পরিচয় পেতেই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘পুরো কক্সবাজারেই কোনো ডুবুরি নেই কেন? আপনারা সরকারকে বলতে পারেন না, চকরিয়ায় ডুবুরি দিতে। কাল যদি তাৎক্ষণিক ডুবুরি পেতাম আমার মেয়েকে জীবিত ফিরে পেতাম। চার ঘণ্টা পর কেন চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি আনতে হবে?’

শিখা আকতারের প্রসঙ্গ উঠতেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন রোজিনা। তিনি বলেন, ‘আমার একটিমাত্র সন্তান। এই সন্তানের মুখ চেয়ে জীবন কাটাচ্ছিলাম, সে–ও আমাকে একা করে দিয়ে চলে গেছে। আমি কী নিয়ে বাঁচব।’

কান্নার এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন রোজিনা। পানি ও লেবুর সুগন্ধি নাকে দিলে ১০-১২ মিনিট পর জ্ঞান ফেরে তাঁর। আবারও বলতে থাকেন, ‘আমার মেয়ে হলেও শিখা, ছেলে হলেও শিখা। ছেলেমেয়ের সব আদর ওকেই দিতাম। এখন ও আমাকে একা করে দিল। আল্লাহ আমার ওপর এ কেমন প্রতিশোধ নিল! ও খোদা, আমি এমন কী অপরাধ করেছিলাম তোমার। আমার কলিজাটা ছিঁড়ে নিলে তুমি।’

আসমাউল হোসনা ও তাসপিয়া জান্নাতের বাবা নুরুল আবছার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়েরা মাঝেমধ্যে নদীতে গোসল করতে যায়। আমরা জানতে পারলে বকা দিই। ওরা সাঁতার জানে না। গতকালও আমাদের অগোচরে গোসলে গেছে। আরেকটু এদিক-ওদিক হলেই আমার দুই মেয়েকে হারাতাম।’ অবৈধভাবে বালু তোলা বন্ধ করতে প্রশাসনকে অনুরোধ করেন তিনি।

স্থানীয় লোকজন বলেন, মাতামুহুরী নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলায় কিছু গুপ্তগর্তের সৃষ্টি হয়েছে। শিখা যেখানে ডুবে মরেছে, একই স্থানে ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই ফুটবল খেলতে গিয়ে পাঁচ স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়েছিল। এত মৃত্যুর পরও মাতামুহুরী নদী থেকে বালু উত্তোলন থেমে নেই।

ডুবুরির অপ্রতুলতার কথা জানিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, চকরিয়ার স্টেশন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দিদারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে ডুবুরি খুব কমই আছে। বিভাগীয় পর্যায়ে তাঁদের অবস্থান থাকে। প্রতিটি উপজেলায় না হলেও জেলা পর্যায়ে একটি ডুবুরি টিম থাকা দরকার।

দিদারুল হক বলেন, ‘অনেক সময় নদীতে গভীরতা বেশি থাকলে এবং স্রোত বেশি হলে আমরা কাজ করতে পারি না। উদ্ধারের সরঞ্জামও নেই। এ কারণে স্থানীয় লোকজন আমাদের ওপর খেপে যায়। তখন খুব বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।’

Lading . . .