শাই হোপের ঝোড়ো শতরানে উড়ে গেল ভারত, রেকর্ড ২৪৯ রান করেও উইন্ডিজ়ের কাছে হারতে হলো ৬ উইকেটে
প্রকাশ: ৯ অক্টোবর, ২০২৬
ব্যাট হাতে রেকর্ড গড়ে নিন্দুকদের জবাব দিলেন সঞ্জু স্যামসন । অন্য ব্যাটাররাও দেখালেন দাপট, ভারতের স্কোরবোর্ডে উঠল ২৪৯ রান। তার পরেও জয় এল না। রাঁচিতে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভারতকে ৬ উইকেটে হারিয়ে সিরিজ়ে সমতা ফেরাল ওয়েস্ট ইন্ডিজ় । শাই হোপের বিধ্বংসী শতরান এবং শেরফেন রাদারফোর্ডের ঝোড়ো ইনিংসের সামনে কার্যত অসহায় আত্মসমর্পণ করল ভারতের বোলিং বিভাগ। মায়াঙ্ক যাদব তিন উইকেট নিয়ে লড়াইয়ের চেষ্টা করলেও, ভারতীয় বোলাররা এ দিন অকাতরে রান বিলোলেন। স্বাভাবিক ভাবেই ব্যাটারদের দাপটে বিশাল রান তুলেও এই হার ভারতের বোলিংয়ের দুর্বলতা এবং দল নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল।
সঞ্জুর ব্যাটে রেকর্ড, বড় রান ভারতের
প্রথম ম্যাচে ব্যাট হাতে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি সঞ্জু স্যামসন (Sanju Samson)। দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতেই দুরন্ত ইনিংসে সমালোচকদের জবাব দিলেন ভারতীয় উইকেটকিপার-ব্যাটার। মাত্র ৪১ বলে ৮২ রান করেন তিনি। ইনিংসে ছিল ন'টি চার ও চারটি ছয়। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বোলারদের উপর চাপ তৈরি করেন সঞ্জু। মাত্র ২১ বলে অর্ধশতরান করে ক্যারিবিয়ানদের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতীয়দের মধ্যে দ্রুততম অর্ধশতরানের নজিরেও বিরাট কোহলির পাশে বসেন তিনি।
সঞ্জুর পাশাপাশি ভারতের বড় স্কোর গড়ার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল অন্য ব্যাটারদেরও। ঈশান কিষান (Ishan Kishan) ২২ বলে ৪৩ রান করেন। তাঁর ইনিংসে ছিল পাঁচটি চার ও দু'টি ছয়। তিন নম্বরে নেমে শ্রেয়স আইয়ার (Shreyas Iyer) ১৮ বলে ৪০ রান করে ইনিংসের গতি ধরে রাখেন। তাঁর ব্যাট থেকে আসে পাঁচটি চার ও দু'টি ছয়। শেষ দিকে তিলক বর্মা (Tilak Varma) আরও আগ্রাসী ব্যাটিং করেন। মাত্র ১৮ বলে অপরাজিত ৪৪ রান করেন তিনি। ইনিংসে ছিল তিনটি চার ও চারটি ছয়। অভিষেক শর্মা (Abhishek Sharma) ১২ বলে ২০ রান করে শুরুটা ভালো করেন। শিবম দুবে (Shivam Dube) ১০ বলে সাত রান করে আউট হন। অন্য দিকে, নমন ধীর (Naman Dhir) এক বলে চার রান করে অপরাজিত থাকেন।
সঞ্জু, ঈশান, শ্রেয়স ও তিলকের সম্মিলিত ব্যাটিংয়ে ২০ ওভারে পাঁচ উইকেটে ২৪৯ রান তোলে ভারত। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটাই ভারতের সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর। এর আগে ২০১৬ সালে লডারহিলে ক্যারিবিয়ানদের বিরুদ্ধে চার উইকেটে ২৪৪ রান তুলেছিল ভারত। সেই ম্যাচেও শেষ বলে এক রানে হারতে হয়েছিল বিরাট কোহলিদের। রাঁচিতে এ বার পুরনো রেকর্ড ভেঙে নতুন নজির গড়লেও জয় অধরাই থেকে গেল ভারতের।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের হয়ে রস্টন চেজ (Roston Chase) চার ওভারে ২৪ রান দিয়ে তিন উইকেট নেন। শামার স্প্রিঙ্গার (Shamar Springer) চার ওভারে ৬৪ রান দিয়ে দু’টি উইকেট পান। ভারতের ব্যাটারদের আক্রমণ সামলাতে গিয়ে ক্যারিবিয়ান বোলারদেরও যথেষ্ট সমস্যায় পড়তে হয়। তবু শেষ পর্যন্ত তাঁদের ব্যাটাররা যে ভাবে পাল্টা আক্রমণ করলেন, তাতেই ম্যাচের ফল নির্ধারিত হয়ে গেল।
হোপ-রাদারফোর্ডের ব্যাটে উড়ে গেল ভারতের বোলিং
২৫০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ়। মায়াঙ্ক যাদবের (Mayank Yadav) গতির সামনে প্রথম দিকে উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে তারা। কিন্তু সেই চাপ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। শাই হোপ (Shai Hope) ও শেরফেন রাদারফোর্ড (Sherfane Rutherford) ক্রিজ়ে থিতু হতেই ম্যাচের ছবিটা বদলে যায়। ভারতীয় বোলারদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন দুই ব্যাটার। বড় রান তাড়া করতে নেমে যে ভাবে তাঁরা একের পর এক বাউন্ডারি মারতে থাকেন, তাতে ভারতের বোলিং পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে।
হোপ মাত্র ৪৫ বলে ১০২ রান করেন। তাঁর ইনিংসে ছিল সাতটি চার ও ছ'টি ছয়। অন্য দিকে, রাদারফোর্ড ৩৭ বলে ৮৪ রান করেন। তাঁর ব্যাট থেকে আসে পাঁচটি চার ও আটটি ছয়। দুই ব্যাটারের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের রান তোলার গতি এতটাই বেড়ে যায় যে, ভারতীয় বোলাররা কোনও ভাবেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাননি। হোপের শতরান এবং রাদারফোর্ডের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং ভারতের বড় রানের যাবতীয় সুবিধা কেড়ে নেয়। শেষ দিকে রোমারিও শেফার্ড (Romario Shepherd) ১৩ বলে অপরাজিত ৩৪ রান করে দলের জয় নিশ্চিত করেন। তাঁর ইনিংসে ছিল দু’টি চার ও তিনটি ছয়। রোভম্যান পাওয়েল (Rovman Powell) ১৩ বলে ২৪ রান করেন।
১৮.৩ ওভারে চার উইকেটে ২৫২ রান তুলে নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ়। হাতে ছিল ন'টি বল। ছয় উইকেটে এই জয় বুঝিয়ে দিল, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বড় রান করাই শেষ কথা নয়। সেই রান রক্ষা করার মতো বোলিং শক্তিও প্রয়োজন। ভারত ব্যাট হাতে রেকর্ড গড়লেও বল হাতে সেই মানের পারফরম্যান্স দেখাতে পারেনি।
ভারতের হয়ে মায়াঙ্ক যাদব চার ওভারে ৩৬ রান দিয়ে তিন উইকেট নেন। কুলদীপ যাদব (Kuldeep Yadav) চার ওভারে ৫৩ রান দিয়ে একটি উইকেট পান। কিন্তু অক্ষর প্যাটেল (Axar Patel) ৩.৩ ওভারে ৬৩ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থাকেন। অর্শদীপ সিং (Arshdeep Singh) চার ওভারে ৪৫ রান দেন, তিনিও কোনও উইকেট পাননি। শিবম দুবের দুই ওভারে ওঠে ৩০ রান। নমন ধীর দুই ওভারে ২৫ রান দেন। অর্থাৎ, মায়াঙ্ক ও কুলদীপ ছাড়া আর কোনও ভারতীয় বোলার উইকেট পাননি। রান আটকানোর ক্ষেত্রেও ব্যর্থ হয়েছেন প্রায় প্রত্যেকেই।
অভিজ্ঞ পেসারের অভাবই কি বড় ধাক্কা?
ভারতের এই হারের পর দল নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। স্কোয়াডে অভিজ্ঞ পেসারের অভাব কি বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াল? মায়াঙ্ক যাদবের গতি রয়েছে, উইকেট নেওয়ার ক্ষমতাও দেখিয়েছেন তিনি। কিন্তু প্রতিপক্ষ যখন এমন বিধ্বংসী ব্যাটিং করছে, তখন চাপের মুহূর্তে অভিজ্ঞ বোলারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সঠিক সময়ে লাইন-লেন্থ বদলানো, রান আটকে রাখা, ব্যাটারের দুর্বলতা বুঝে বল করা এবং প্রয়োজনের সময়ে উইকেট তুলে নেওয়ার দক্ষতা ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
মায়াঙ্কের তিন উইকেট ভারতের জন্য ইতিবাচক দিক। কিন্তু এক জন বোলার দিয়ে গোটা ইনিংস সামলানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টিতে যেখানে কয়েকটি ওভারই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে, সেখানে অভিজ্ঞ পেসারের উপস্থিতি দলের জন্য বাড়তি ভরসা হতে পারে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের ব্যাটাররা যখন আক্রমণ শুরু করেন, তখন তাঁদের রান তোলার গতি কমানোর মতো কার্যকর পরিকল্পনা ভারতের বোলিং বিভাগে দেখা যায়নি।


