Advertisement

গাজীপুরে শ্রমিক–পুলিশ সংঘর্ষে আহত ৩০, ছুটি ৬০ কারখানায়

প্রথম আলো

প্রকাশ: ৩ নভেম্বর, ২০২৬

গাজীপুর মহানগরীর ভোগড়া এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকেছবি: প্রথম আলো
গাজীপুর মহানগরীর ভোগড়া এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকেছবি: প্রথম আলো

মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরের নাওজোড় ও ভোগড়া এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা এ সংঘর্ষে পুলিশ ও শ্রমিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।

শ্রমিক অসন্তোষের কারণে এর মধ্যেই জেলার অন্তত ৬০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন। তিনি জানান, শ্রমিক নন—এমন সাত নাশকতাকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধের কারণে সকাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। এতে দুই মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে। পরে বেলা সোয়া একটার দিকে প্রায় চার ঘণ্টা পর দুই মহাসড়কেই যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।

শিল্প পুলিশ, শ্রমিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকাল সাড়ে নয়টার দিকে মহানগরের নাওজোড় এলাকায় প্যানিসিয়া লিমিটেডের শ্রমিকেরা কারখানা থেকে বের হয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের উড়ালসড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে তাঁরা বাঁশ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

একই সময়ে কোনাবাড়ীর বে ফুটওয়্যার, মৌচাক এলাকার পূর্বাণী এবং তেলিচালা এলাকার লগোস অ্যাপারেলস ও এটিএস অ্যাপারেলসের শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে কারখানা থেকে বেরিয়ে আসেন। পরে তাঁরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।

অন্যদিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া এলাকায় কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। খবর পেয়ে বিজিবি, শিল্প পুলিশ ও থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করেন। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

একই সময়ে ভোগড়া বাইপাস এলাকায়ও শ্রমিকেরা টায়ার জ্বালিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। সেখানেও পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে তাঁদের সরিয়ে দেয়।

কয়েক দিন ধরেই বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় পুলিশ, সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া পুলিশের গাড়ি, বিভিন্ন যানবাহন ও কারখানার গুদামে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

এদিকে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

কয়েক দিন ধরেই বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় পুলিশ, সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া পুলিশের গাড়ি, বিভিন্ন যানবাহন ও কারখানার গুদামে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ১২ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ড্রোন ও সদস্যদের শরীরে থাকা বডি ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে সরাসরি নজরদারিও করা হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এতে বলা হয়, গাজীপুরের সফিপুর, কালিয়াকৈর ও কোনাবাড়ী এলাকায় ১০ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া এলাকায় ২ প্লাটুন বিজিবি সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।

আশুলিয়া, মিরপুরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, স্থানীয় প্রশাসন ও অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করছেন বিজিবি সদস্যরা। জননিরাপত্তা, স্বাভাবিক চলাচল ও শিল্পাঞ্চলের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কেউ শ্রমিক নন: ডিআইজি

গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের কেউ শ্রমিক নন বলে দাবি করেছেন ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও যাঁরা আন্দোলন করবেন, ধরে নিতে হবে তাঁরা শ্রমিকদের দাবির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আজ বেলা তিনটার দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ইন্টারস্টফ অ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানার সামনে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন মোস্তাফিজুর রহমান।

ডিআইজি বলেন, ‘যাঁরা শ্রমিক, তাঁরা কাজ করতে চান। যাঁরা শ্রমিক, তাঁরা কাজে যোগ দিন। পুলিশ আপনাদের নিরাপত্তা দেবে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা শুধু রাস্তায় নয়, তাঁদের বাসাসহ সব জায়গায় দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে জেলা পুলিশ ও শিল্প পুলিশ যথেষ্ট সচেতন ও সোচ্চার।’

গ্রেপ্তারের বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গাজীপুর জেলা পুলিশ এখন পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্য জেলায় ১৫ জন এবং নারায়ণগঞ্জে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের কেউই শ্রমিক নন। গাজীপুরে আজকের একটি মিছিল থেকে ছাত্রলীগের পদধারী একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শ্রমিকের নাম করে এখানে ভিন্ন কিছু চলছে। এটা কখনোই সফল হবে না। পুলিশ কঠোর হাতে দমন করবে।

শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এ আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রম খাতকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা চলছে। এর পেছনে যাঁরা ইন্ধন দিচ্ছেন বা অর্থায়ন করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনের মধ্যে থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ সময় গাজীপুরের পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন, কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলামসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Lading . . .