Advertisement

মতিউরের শিঙাড়ার টানে বদলে গেল বকুলতলার নাম

প্রথম আলো

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভেজে রাখা শিঙাড়াছবি: প্রথম আলো
ভেজে রাখা শিঙাড়াছবি: প্রথম আলো

দুপুর গড়াতেই টাঙ্গাইল-আরিচা সড়কের বকুলতলা মোড়ে একের পর এক যানবাহন থামতে শুরু করে। সেখানে যাত্রীরা নেমে ভিড় করেন মতিউর রহমানের শিঙাড়ার দোকানের সামনে। কেউ পাঁচটি, কেউ ১০টি—যতটা সম্ভব শিঙাড়া কিনে আবার গন্তব্যের পথে ছুটে যান। এই শিঙাড়ার টানেই বদলে গেছে জায়গাটির পরিচয়ও।
মতিউরের তৈরি এই শিঙাড়ার সুনাম আশপাশের এলাকা ও দূরদূরান্তেও ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় মানুষের কাছে তাই বকুলতলার এই মোড় এখন ‘শিঙাড়ার মোড়’ নামেই পরিচিত।

দোকানটি টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দক্ষিণে বকুলতলা মোড়ে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই দোকানে এসে প্রতিদিন লাইন ধরে শিঙাড়া কেনেন।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মতিউর রহমানের দোকানে গিয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁর দোকানের পেছনেই তাঁদের বাড়ি। তাঁর বাবা আগে সেখানে ছোট একটি মনিহারির দোকান করতেন। ২৫ বছর আগে বাবা মারা যান। তখন তিনি বাবার মনিহারি দোকান চালাতে শুরু করেন। কয়েক বছর পর মনিহারি ব্যবসার পাশাপাশি শুরু করেন চা, শিঙাড়া, পুরি, পেঁয়াজু বিক্রি। পাঁচ থেকে সাত বছর এসব পণ্য বিক্রি করতে করতে তাঁর শিঙাড়ার সুনাম আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। শিঙাড়ার চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তাই চা, পুরি, পেঁয়াজু বাদ দিয়ে কয়েক বছর ধরে শুধু শিঙাড়াই বিক্রি করেন। প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার শিঙাড়া বিক্রি হয়। প্রতিটি শিঙাড়া ১০ টাকা করে বিক্রি করেন। এই দোকানের আয় দিয়েই তাঁর আট সদস্যদের পরিবার চলে।

মতিউর আরও বলেন, সকাল থেকে বাড়িতে আলু কেটে তা রান্না করেন। ময়দা মাখিয়ে নেন। এ কাজে তাঁকে তাঁর স্ত্রী সহায়তা করেন। দুপুরের পর দুই ছেলে নীরব হাসান ও রিফাদ হাসানকে নিয়ে তিনি দোকান শুরু করেন। শিঙাড়া তৈরি ও বিক্রি দুপুর থেকে রাত ৮টা, কখনো কখনো রাত ৯টা পর্যন্ত চলে।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে কড়াইয়ে ডুবো তেলে মতিউরকে শিঙাড়া ভাজতে ও পাশে তাঁর দুই ছেলেকে শিঙাড়া তৈরি করতে দেখা যায়। পাঁচ-ছয়জন ক্রেতা অপেক্ষা করছিলেন শিঙাড়ার জন্য। কিছুক্ষণ পর ভাজা শেষ হলে ৩০ থেকে ৩৫টি শিঙাড়া নামানো হয় কড়াই থেকে। কেউ পাঁচটি, কেউ ১০টি এভাবে শিঙাড়া নিয়ে নেন। দোকানে বসেও খাওয়া শুরু করেন কয়েকজন। পরে আবার নতুন করে ভাজা শুরু হয়। নতুন ক্রেতাও এসে শিঙাড়ার জন্য অপেক্ষা শুরু করেন। এভাবে চলে রাত ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত।

নীরব হাসান ও রিফাত হাসান বলেন, তাঁদের বাবার শিঙাড়ার সুনাম সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়লে বিক্রি অনেক বেড়ে যায়। তাই বাবাকে তাঁরা দুজনও শিঙাড়া তৈরিতে সহায়তা করেন। তাঁরাও বাবার মতো শিঙাড়া তৈরি করতে পারেন।

সেখানে কথা হয়, কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গেও। টাঙ্গাইল শহরের কচুয়াডাঙ্গা থেকে আসা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এই শিঙাড়া ভিন্ন স্বাদের। তাই এর এত নাম। এ জন্য শিঙাড়া খাওয়ার জন্য এখানে চলে আসি।’

টাঙ্গাইল থেকে নাগরপুরগামী যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশা এসে থামে মতিউরের দোকানের সামনে। অটোরিকশা থেকে নেমে আসেন নাগরপুরের ঘুনিসিংজোড়া গ্রামের সোহান হোসেন। তিনি বলেন, ‘এ পথে যাওয়ার সময় আমি সব সময় এই শিঙাড়া নিয়ে যাই। বাড়ির সবাই এ শিঙাড়া পছন্দ করেন।’

একটি বেসরকারি কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি শফিকুল ইসলাম বলেন, এ দোকানের শিঙাড়ার স্বাদ আলাদা। তাই এ পথে চলাচলের সময় এই শিঙাড়া খেয়ে যাই।

বকুলতলা বাজারের ব্যবসায়ীরাও মতিউরের শিঙাড়ার স্বাদের প্রশংসা করলেন। এমন একজন ব্যবসায়ী জোসন আলী। তিনি বলেন, এই শিঙাড়ার নাম সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। শহর থেকে মানুষ চলে আসেন শিঙাড়া কিনতে। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে শিঙাড়া কিনে নেন। এ জন্য লোকজন বকুলতলার মোড়কে এখন শিঙাড়ার মোড় নামেও চেনেন।

কী কারণে শিঙাড়ার এত সুনাম—এ কথা মতিউর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুই–এক দিন পরপর ভাজার তেল পাল্টাই। পরিবারের সবাই মিলে যত্ন করে শিঙাড়া তৈরি করি। তাই অন্য শিঙাড়া থেকে এর স্বাদ একটু বেশি। আর এ ছাড়া ওপরওয়ালার একটা রহমত আছে আমাদের ওপর। তাই হয়তো আমার শিঙাড়া খেতে অনেক দূর থেকে মানুষ চলে আসেন।’

Lading . . .