Advertisement

ময়মনসিংহে অগ্রণী ব্যাংকের একটি এজেন্ট শাখায় টাকা জমা দিয়ে সঞ্চয়পত্রের রসিদ পেলেও পরে মূল ব্যাংকে গিয়ে গ্রাহকেরা জানতে পারেন, তাঁদের নামে সঞ্চয়পত্র হয়নি।

প্রথম আলো

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা সংবাদ সম্মেলন করেন। গতকাল বুধবার দুপুরে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সিংরইল ইউনিয়নের উদং মধুপুর গ্রামের শেয়ালধরা বাজারেছবি: প্রথম আলো
ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা সংবাদ সম্মেলন করেন। গতকাল বুধবার দুপুরে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সিংরইল ইউনিয়নের উদং মধুপুর গ্রামের শেয়ালধরা বাজারেছবি: প্রথম আলো

পোশাক কারখানায় কাজ করে দুই লাখ টাকা জমিয়েছিলেন শোভা খাতুন। নিরাপদে রাখার পাশাপাশি মুনাফার আশায় অগ্রণী ব্যাংকের একটি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে পারিবারিক সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য সেই টাকা জমা দেন। পরে জমা দেন আরও ৮০ হাজার টাকা। দুই দফায় টাকা জমা দেওয়ার পর তাঁকে রসিদও দেওয়া হয়েছিল।

এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটটি বন্ধ হওয়ার পর মূল শাখায় গিয়ে শোভা জানতে পারেন, তাঁর নামে কোনো সঞ্চয়পত্র করা হয়নি। হাতে থাকা রসিদটিও ভুয়া।

শুধু শোভা নন, ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সিংরইল ইউনিয়নের উদং মধুপুর গ্রামের শেয়ালধরা বাজারের অগ্রণী ব্যাংকের ওই এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন গ্রাহক। তাঁদের কারও কাছ থেকে টাকা নিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনার কথা বলে আত্মসাৎ করা হয়েছে। আবার কারও ব্যাংক হিসাব থেকে অনুমোদন ছাড়া টাকা স্থানান্তর ও নগদ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এজেন্ট হিসেবে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও ব্যাংকের নাম ও সাইনবোর্ড ব্যবহার করে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে।

অগ্রণী ব্যাংকের কালীগঞ্জ বাজার শাখার অধীনে ছিল ওই এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটটি। এর স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান ‘পড়শী সেবালয়’। মালিক মাজহারুল ইসলাম ওরফে মিজান। ২০২০ সালের জুনে আউটলেটটির কার্যক্রম শুরু হয়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ২ হাজার ৮০০ গ্রাহক ছিলেন। ২০২৫ সালের ২১ জুন এজেন্টটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ বছরের ১৮ আগস্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারা গিয়ে আউটলেটটির সাইনবোর্ড খুলে নেন।

উদং মধুপুর গ্রামের শোভা খাতুন বলেন, ‘গার্মেন্টসে চাকরি করে তিল তিল করে টাকাগুলো জমিয়েছি। আমার ছোট ছেলে আছে। স্বামী অসুস্থ, কর্মহীন। সংসার চালানোই কষ্টের। ভেবেছিলাম, প্রয়োজনের সময় এই টাকা তুলে ছেলেকে পড়াশোনা করাব। এখন শুনছি, আমার টাকা ব্যাংকে জমাই হয়নি।’

নারায়ণপুর গ্রামের শামছুন্নাহারের স্বামী সৌদিপ্রবাসী। বাড়ি নির্মাণের জন্য স্বামী তাঁকে ২৪ লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন। এজেন্ট শাখায় গত বছরের ৩ মার্চ ১৭ লাখ এবং ১ এপ্রিল ৭ লাখ টাকা জমা দিয়ে তিনি দুটি সঞ্চয়পত্র কেনেন। তাঁকে রসিদও দেওয়া হয়েছিল। পরে মূল শাখায় গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর নামে কোনো সঞ্চয়পত্র নেই।

চরকাশিনগর গ্রামের আনসার সদস্য সোহেল মিয়ার অভিজ্ঞতাও একই। গত বছরের ১৫ এপ্রিল সাড়ে ৯ লাখ টাকা দিয়ে তিনি পারিবারিক সঞ্চয়পত্র কেনেন। তাঁর কাছেও রসিদ রয়েছে। তবে মূল ব্যাংক জানিয়েছে, সেটি ভুয়া।

অগ্রণী ব্যাংকের কালীগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এজেন্ট শাখাটির কার্যক্রম বন্ধের পর এক গ্রাহক তাঁর হিসাবে টাকা না থাকার অভিযোগ করেন। যাচাই করে দেখা যায়, ওই হিসাব থেকে বিভিন্ন সময়ে অন্য হিসাবে টাকা স্থানান্তর ও নগদ উত্তোলন করা হয়েছে। পরে জোনাল অফিস ও প্রধান কার্যালয়ের তদন্ত দল বিষয়টি খতিয়ে দেখে।

হাফিজুর রহমান জানান, তদন্তে একটি হিসাব থেকে ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া প্রায় ৪৬ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ও এফডিআর (মেয়াদি আমানত) এবং ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা রসিদের মাধ্যমে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব লেনদেনের কোনো দাপ্তরিক নথি ব্যাংকে নেই। এজেন্ট আউটলেট থেকে সঞ্চয়পত্র ইস্যুর অনুমোদনও নেই। গ্রাহকদের অভিযোগ অনুযায়ী, আত্মসাতের পরিমাণ প্রায় ৭৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। প্রাথমিকভাবে ৬২ লাখ টাকা আত্মসাতের সত্যতা মিলেছে। বিষয়টি প্রধান কার্যালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করছে।

অভিযোগের বিষয়ে এজেন্টের স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পারিবারিক সঞ্চয়পত্রসহ যেসব কাগজ গ্রাহকেরা দেখাচ্ছেন, সেগুলো ব্যবহারের অনুমোদন তাঁর এজেন্ট শাখার ছিল না। কীভাবে এসব কাগজ ব্যবহার করা হয়েছে, তা তিনি জানেন না। গ্রাহকদের টাকা নেওয়ার অভিযোগে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মাজহারুল ইসলাম ওরফে সোহেলের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলাটির তদন্ত করছে।

গতকাল বুধবার দুপুরে ভুক্তভোগীরা ওই এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে লিখিত বক্তব্য দেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর আলম। তাঁর অভিযোগ, আউটলেট কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পরও তথ্য গোপন করে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। টাকা ফেরত পেতে উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তাঁরা।

Lading . . .