প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শিশুটির বয়স ১১ বছর। দীর্ঘদিন ধরে সে মায়াস্থেনিয়া গ্র্যাভিসে (একধরনের স্নায়ুরোগ) ভুগছিল। উচ্চমাত্রার ওষুধ নিতে হতো। রোগ সারাতে চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে বুকের হাড় কেটে এই অস্ত্রোপচার করতে হয়। শিশুটি ভয়ে অস্ত্রোপচার করাতে চাইছিল না। তার পরিবারও বুক কেটে অস্ত্রোপচারে রাজি হচ্ছিল না। এভাবেই কেটে যায় প্রায় ছয় মাস।
এর মধ্যে গত ৩১ আগস্ট রাজধানীর ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে একটি রোবোটিক সার্জারি হয়। হাসপাতালটির এন্ডো-ল্যাপারোস্কপিক অ্যান্ড রোবোটিক সার্জারি বিভাগের ভিজিটিং কনসালট্যান্ট এবং অ্যাডভান্সড এন্ডো–ল্যাপারোস্কপিক সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক রফিকুস সালেহীন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একজন পুরুষ রোগীর পিত্তথলি অপসারণ করেন।
একই দিনে প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান ও চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক সামছাদ জাহান রোবটের সহায়তায় এক নারী রোগীর জরায়ু অপসারণ করেন।
সেই শিশুও একই হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদের তত্ত্বাবধানে ছিল। শিশুটির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এই চিকিৎসক। ওই দিন সন্ধ্যায় শিশুটির পরিবার হাসপাতালে চলে আসে। ২ সেপ্টেম্বর রোবটের সহায়তায় অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ শিশুটির প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করেন। বুক কাটতে হয়নি, ছোট ছিদ্র করেই পুরো অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন করা গেছে।
অস্ত্রোপচারের পরদিন সকালেই চিকিৎসকের সঙ্গে শিশুটি ফুটবল খেলে। অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘প্রচলিত ধারায় এ ধরনের অস্ত্রোপচারের পর দেড় মাস আমরা ভারী কাজ করতে দিই না। তিন মাস পরে রোগীকে বাইরে বেরোতে দিই। ছয় মাস পরে খেলাধুলার প্রসঙ্গ আসে; আর এখানে শিশুটি পরদিন সকালেই ফুটবল খেলেছে; আর যেহেতু সার্জনের সঙ্গেই খেলেছে, সার্জন নিরাপদ নিশ্চিত হয়েই পারমিশন দিয়েছেন।’
অনেকেই মনে করেন, রোবোটিক সার্জারিতে রোবট নিজে স্বাধীনভাবে অস্ত্রোপচার করে। তবে চিকিৎসকেরা জানান, ধারণাটি সঠিক নয়। রোবোটিক সার্জারি মূলত রোবটের সহায়তায় অস্ত্রোপচার।
অধ্যাপক রফিকুস সালেহীন বলেন, রোবোটিক সার্জারিতেও সার্জনের ভূমিকাই মুখ্য। রোবট সহায়ক হিসেবে থাকে। প্রচলিত অস্ত্রোপচারে সার্জন নিজে হাতে কাজগুলো করেন। এখানে রোবোটিক বাহু সহায়তা করে। বাহুগুলোকে সার্জনই নিয়ন্ত্রণ করেন। সার্জনের সামনে ‘থ্রিডি মনিটর’ থাকে। সেখানে তাঁরা সরাসরি অঙ্গপ্রতঙ্গের ত্রিমাত্রিক দৃশ্য দেখতে পান।
সেটি দেখে সার্জন রোবোটিক বাহুগুলোকে পরিচালনা করে অস্ত্রোপচার করেন। অনেকটা ল্যাপারোস্কপিক সার্জারির মতো। তবে রোবোটিক সার্জারিতে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলো অনেক বেশি নমনীয়। এতে ‘৩৬০ ডিগ্রি নড়াচড়া’র সুবিধা পাওয়া যায়। ফলে সূক্ষ্মভাবে কাঙ্ক্ষিত স্থানে অস্ত্রোপচার করা যায়।
রফিকুস সালেহীন বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশে আগে থেকেই কিন্তু এটা (রোবোটিক সার্জারি) ছিল। আমরা একটু পিছিয়ে ছিলাম। আমি বলব, এই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আমাদের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।’
ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে ব্যবহৃত রোবটটির নাম ‘মেডবট তুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবট’। চীনের তৈরি রোবটটির ব্যবহার শিখতে চীনে দুই দফা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন চিকিৎসকেরা। প্রশিক্ষণে ধাপে ধাপে কৃত্রিম অঙ্গ এবং প্রাণীর অঙ্গে অস্ত্রোপচার করেন তাঁরা। বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা পরে চীনের চিকিৎসকদের সঙ্গে মানুষের অস্ত্রোপচারে অংশ নেন।
এরপর তাঁরা রোবোটিক সার্জারির সার্টিফিকেট অর্জন করেন। মেডবট রোবটটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে আনা হয়। তবে অস্ত্রোপচারের জন্য সরকারি অনুমতি ছিল না। অনুমতি পাওয়ার পর গত মাসে প্রথম অস্ত্রোপচারটি করা হয়।
রফিকুস সালেহীন জানান, ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ১২ জন রোগীর রোবোটিক সার্জারি করা হয়েছে। রোগীদের প্রত্যেকেই সুস্থ্ আছেন।
ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের ইউরোলজি বিভাগের প্রধান ও কনসালট্যান্ট হাসিনা সাদিয়া খান রোবটের সহায়তায় এক রোগীর পাইলোপ্লাস্টি (কিডনির সঙ্গে মূত্রনালির সংযোগস্থলের সংকীর্ণতা দূর করার অস্ত্রোপচার) করেন। রোগীর বয়স ছিল ১৭ বছর।
হাসিনা সাদিয়া খান বলেন, ‘শিশুটি ছিল চিকন স্বাস্থ্যের। ল্যাপারোস্কপির জন্য প্রশস্ত জায়গা হলে ভালো; কিন্তু এই রোগীর পেটে জায়গা কম ছিল। এ রকম ক্ষেত্রে ভিশন বা কাজের জায়গা পাওয়া যায় না। এই রোগীর জন্য রোবোটিক সার্জরি সবচেয়ে উপযোগী। ভেতরে অনেক সুন্দর করে অল্প জায়গার মধ্যে কাজগুলো করে ফেলা গেছে।’ এই চিকিৎসক জানান, বিশ্বে রোবোটিক সার্জারির ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই ইউরোলজিক সার্জারি। গাইনোকোলজিতেও রোবোটিক সার্জারির ব্যবহার বেশি। এই অস্ত্রোপচারগুলো শরীরের খুব ছোট এবং জটিল অংশে করতে হয়।
অধ্যাপক সামছাদ জাহান জানান, রোবোটিক সার্জারির একটি সুবিধা হলো অস্ত্রোপচারের সময় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও গঠন অনেক বড় করে দেখা যায়। প্রায় ১৫ থেকে ২০ গুণ বড় করেও দেখা সম্ভব। এ ছাড়া এই পদ্ধতিতে সার্জনের হাতের স্বাভাবিক কাঁপুনি বা ট্রেমর ফিল্টার করা হয়। ফলে আশপাশের টিস্যু কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তুলনামূলক নিখুঁতভাবে অস্ত্রোপচার করা যায়।
রোবোটিক সার্জারিতে ছোট ছিদ্র করে অস্ত্রোপচার করা হয়। ফলে রক্তপাতও হয় কম। এই অস্ত্রোপচারে ব্যথা এবং শারীরিক ধকলও কম। অস্ত্রোপচারের পর রোগী তুলনামূলক কম সময়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘ধরুন, একজন জনপ্রিয় খেলোয়াড়। তাঁর একটি সার্জারি দরকার। আমরা যদি বুক কেটে অস্ত্রোপচার করে বলি, আগামী ছয় মাস আপনি মাঠে দৌড়াতে পারবেন না, তাহলে কিন্তু তাঁর ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে। এ রকম ক্ষেত্রে রোবোটিক সার্জারি সুবিধাজনক।’
তবে রোবোটিক সার্জারি ব্যয়বহুল। দেশে এই অস্ত্রোপচারের খরচ ল্যাপারোস্কপিক সার্জারির তুলনায় দুই থেকে আড়াই গুণ। সেটিও অবশ্য বিদেশের তুলনায় বেশ কম। চিকিৎসকদের আশা, দেশেই এই অস্ত্রোপচার চালু হওয়ায় ‘মেডিক্যাল ট্যুরিজম’ কমবে। ফলে দেশের টাকা দেশেই থাকবে।
চিকিৎসক রফিকুস সালেহীন বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে এই অস্ত্রোপচারের খরচ অনেক বেশি। সেটি তো শুধু হাসপাতালের খরচ। তারপর রোগীর সঙ্গে যিনি গেলেন, তাঁর থাকার খরচ আছে; তো আমরা মনে করি, সবকিছু মেলালে রোগীর জন্য দেশে চিকিৎসা অনেক সুবিধাজনক।’ এই চিকিৎসক মনে করেন, সময়ের সঙ্গে এই খরচ আরও কমে আসবে। দেশের বাইরে থেকেও রোগীরা কম খরচে অস্ত্রোপচার করাতে বাংলাদেশে আসবেন বলে তাঁর আশা।
রোবোটিক সার্জারি চালু হওয়ায় অভিজ্ঞ বিদেশি সার্জনদেরও অস্ত্রোপচারে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে। মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ জানান, বিদেশের অভিজ্ঞ সার্জনরা অনলাইনে যুক্ত হতে পারবেন। দূর থেকেই জটিল অস্ত্রোপচার তদারকি করতে পারবেন। এমনকি অনুমতি সাপেক্ষে অস্ত্রোপচারে অংশও নিতে পারবেন।
ক্যানসারের অস্ত্রোপচারে রোবোটিক সার্জারির কার্যকারিতা বেশি। আগামী দিনে কোলন, পাকস্থলী, অন্ত্র, কিডনি, প্রোস্টেট ও জরায়ুর অস্ত্রোপচারে এর ব্যবহার বাড়বে বলে মনে করছেন ইউনাইটেডের এই চিকিৎসকেরা।
চিকিৎসকদের দেশের বাইরে থেকে রোবোটিক সার্জারির প্রশিক্ষণ নিতে হয়। সেটি বেশ ব্যয়বহুল। অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দেশেই প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন চিকিৎসকেরা।
অধ্যাপক সামছাদ জাহান বলেন, ‘আমি যে ফেলোশিপ (রোবোটিক সার্জারি–সংক্রান্ত) করলাম, অনেক খরচ। আমাদের নতুন ডাক্তারদের পক্ষে সম্ভব না।…এখন দেশের স্টুডেন্টদের আমরা নিজেরাই ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে পারব। আমার মনে হয় যে এটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এবং আমাদের ইচ্ছা আছে।’


