‘কোনও কিছু প্রমাণ করার ছিল না’, ডার্বি জিতে জবাব পানোসের, মাথায় ৭টি সেলাই পড়ল দ্রাজ়িচের
প্রকাশ: ৮ অক্টোবর, ২০২৬
পঞ্চাশ বছর পর আবার ইতিহাস। ১৯৭৬ সালে কিংবদন্তি কোচ পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধীনে যে কৃতিত্ব অর্জন করেছিল মোহনবাগান, ২০২৬-এ সেই ডাবলের পুনরাবৃত্তি করল সবুজ-মেরুন। সেপ্টেম্বরে আট বছরের খরা কাটিয়ে কলকাতা ফুটবল লিগ জয়ের পর বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে IFA শিল্ড ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গলকে (East Bengal) ১-০ গোলে হারিয়ে ২২তম শিল্ড জিতল মোহনবাগান (Mohun Bagan)। ডুরান্ড ফাইনালে ১-৪ গোলে হারের জবাবও দিল তারা। প্রথমার্ধে সমির জ়েলকোভিচের (Samir Zeljkovic) একমাত্র গোলেই ম্যাচের ফয়সালা। ডুরান্ডের সেই হারের পর প্রবল সমালোচনার মুখে পড়া কোচ পানাগিয়োটিস দিমপেরিস (Panagiotis Dimperis) কাছেও এই জয়টা তাই বিশেষ স্বস্তির।
ডুরান্ডের হারের পর জবাব পানোসের
ডুরান্ড ফাইনালের পর পরিস্থিতি একেবারেই অন্য রকম ছিল। ইস্টবেঙ্গলের কাছে বড় ব্যবধানে হারের পর প্রশ্ন উঠেছিল মোহনবাগানের কোচকে নিয়েও। শিল্ড ফাইনালের আগে তাই ইস্টবেঙ্গলকেই ফেভারিট ধরা হচ্ছিল। সেমিফাইনালে টাইব্রেকারে কোনওক্রমে জিতেছিল মোহনবাগান, অন্য দিকে নর্থইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে সাত গোল করে ফাইনালে এসেছিল লাল-হলুদ। কিন্তু ডার্বির মঞ্চে আগের হিসাবের কোনও গুরুত্ব থাকল না। প্রথম কয়েক মিনিটে পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে না পারলেও দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নেয় মোহনবাগান। পানোস বলেন, ‘আমরা ম্যাচটা ভালো ভাবে শুরু করতে পারিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে গিয়ে একটা ভুল হয়েছিল। ঠিক কী ভুল হয়েছিল, সেটা বলতে পারব না। তবে সাত মিনিটের পর আমরা সেটা ঠিক করে নিই। তার পর থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে চলে আসে।’
ডুরান্ডের হারের বদলাকে অবশ্য প্রতিশোধ বলতে রাজি নন গ্রিক কোচ। সুবজ-মেরুন কোচ বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে আমার কোনও রকম খারাপ অনুভূতি নেই। এটা ফুটবল। আমরা প্রথম ম্যাচ জিতেছিলাম, পরের ম্যাচ হেরেছিলাম। আজ আমরা নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে প্রমাণ করেছি। আগের ম্যাচে আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না। আজ স্বস্তি পেয়েছি, কারণ আমার দলকে ভালো খেলতে এবং পারফর্ম করতে দেখেছি।’ ম্যাচের পর নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমালোচনাকেও গুরুত্ব দেননি পানোস। তাঁর সাফ দাবি, ‘কে কী বলছে, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার কিছু প্রমাণ করারও ছিল না। আমি জানি, কী ভাবে কাজ করতে হয়। ইউরোপের অনেক দল যে ধরনের ফুটবল খেলে, আমি সেই ধরনের ফুটবলই খেলাতে চাই। তাই আমি এখানে এসেছি।’
জ়েলকোভিচে মুগ্ধ পানোস
মোহনবাগানের জয়ের নায়ক সমীর জ়েলকোভিচ। কোচের পরিকল্পনা অনুযায়ী ৮ নম্বর পজিশনে থেকে বার বার বক্সে ঢোকার চেষ্টা করেছেন তিনি। সুযোগ পেয়েই প্রথমার্ধে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। পানোস বলেন, ‘সমির আজ ঠিক সেটাই করেছে, যা আমরা ওর কাছে চাই। ওকে ৮ নম্বর পজিশনে থাকতে বলেছিলাম। জায়গা পেলেই বক্সে ঢুকতে হবে। আজ ও সেটাই করেছে এবং সুযোগ পেয়ে গোল করেছে।’
সাতটি সেলাই পড়ল রক্তাক্ত দ্রাজ়িচের
অন্য প্রান্তে লড়াইয়ের আর এক ছবি দেজান দ্রাজ়িচ। দ্বিতীয়ার্ধে ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলারদের সঙ্গে সংঘর্ষে মাথায় গুরুতর চোট পান তিনি। মাথা থেকে রক্ত ঝরলেও মাঠ ছাড়েননি। সাতটি সেলাই পড়েছে তাঁর। মাথার সাদা ব্যান্ডেজ কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্তে লাল হয়ে যায়, তবু খেলার তীব্রতা কমেনি। দ্রাজ়িচকে নিয়ে রসিকতা করে পানোস বলেন, ‘মাথা ফাটার পর দ্রাজ়িচ আরও ভালো খেলেছে। ওর দম যেন আরও বেড়ে গিয়েছিল।’
ফাইনালের আগে ইস্টবেঙ্গলকে ফেভারিট ধরা হলেও চাপ সামলে মাঠে নামার কথা জানিয়েছেন দ্রাজ়িচ। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমেই ইস্টবেঙ্গলকে অভিনন্দন জানাতে চাই। ওরাও ভালো খেলেছে। নর্থইস্টের বিরুদ্ধে ওদের সাত গোলের ম্যাচটাও আমি দেখেছিলাম। কিন্তু জানতাম, সেই ম্যাচের সঙ্গে ডার্বির কোনও মিল নেই। ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে খেলতে নামার আগে আমরা অন্য কিছু নিয়ে ভাবি না। জানতাম, চোখে চোখ রেখে লড়াই করতে পারব।’
তবে ডার্বির গুরুত্বের কারণে চাপ যে ছিল, সেটাও লুকোননি সার্বিয়ান ফুটবলার। বলেন, ‘এই ধরনের ম্যাচে শুধু গোল করলে বা আক্রমণ করলেই হয় না, সবাইকে মিলে রক্ষণও করতে হয়। জানি, এটা ভারতের সবচেয়ে বড় ডার্বি। সমর্থকদের ধৈর্য খুব কম। আমাদের মধ্যে হালকা টেনশন ছিল। তবে আইএসএল শুরুর আগে এই জয় আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়াবে।’ মাথায় চোট নিয়েও ম্যাচ শেষ করার পর দ্রাজ়িচের লড়াই মন কাড়ে সমর্থকদের। তাঁকে ম্যাচের সেরা ফুটবলার নির্বাচন করা হয়। এ দিকে ম্যাচের পর চিকিৎসার জন্য বহুক্ষণ স্টেডিয়ামে থাকতে হয় দ্রাজ়িচকে। তাঁর পাশে ছিলেন গোলদাতা জ়েলকোভিচও। শেষ পর্যন্ত দ্রাজ়িচকে নিয়ে জ়েলকোভিচ অনেক পরে মাঠ ছাড়েন এবং সঙ্গে নিয়ে যান ঐতিহাসিক জয়ের বলটিও।


